রংপুরের চার খুনে বদলাল সময়-স্থান, বাড়ল প্রশ্ন

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার
রংপুরের চার খুনে বদলাল সময়-স্থান, বাড়ল প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসার পর ঘটনাটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও নানা প্রশ্ন। হত্যাকাণ্ডের স্থান, সময় এবং সম্ভাব্য কারণ নিয়ে পুলিশের আগের বক্তব্যের সঙ্গে এবার দেওয়া তথ্যের পার্থক্য দেখা গেছে। একই সঙ্গে হত্যার পর ঘটনাস্থলের ছাদে পানি জমে যাওয়ার ঘটনায় আলামত নষ্ট হয়েছে কি না, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে হত্যাকাণ্ডের নতুন বিবরণ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে বাড়ির ছাদেই হত্যা করা হয়। পরে তাঁদের মরদেহ ছাদ থেকে টেনে সিঁড়ির কাছে রাখা হয়। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকেও পরে বাড়ির ভেতরে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের নতুন ভাষ্যে উঠে এসেছে।

এর আগে পুলিশ কমিশনার একই ঘটনার বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানে হত্যাকাণ্ডের সময় ও স্থান নিয়ে ভিন্ন তথ্য দেওয়া হয়েছিল। আগের ভাষ্যে বলা হয়েছিল, বৃহস্পতিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীকে ছাদে, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে তিনতলার সিঁড়িতে এবং ছেলে আয়ুশকে ঘুমন্ত অবস্থায় দোতলায় হত্যা করা হয়। নতুন বক্তব্যে বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার ভোরের দিকে এবং প্রথম তিনজনকে ছাদেই হত্যা করা হয়।

পুলিশ কমিশনার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রথম সংবাদ সম্মেলনে আসামিদের কাছ থেকে তখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, সেটিই জানানো হয়েছিল। পরে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা যে তথ্য দিয়েছেন, এবার সেটিই তুলে ধরা হয়েছে। ফলে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের বিবরণে পরিবর্তন এসেছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের নতুন ভাষ্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আগে থেকেই গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যাতায়াত করতেন। পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার করে তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে উঠতেন এবং পানির ট্যাঙ্কের আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার রাতে দুই তরুণ কয়েকটি ইয়াবা সেবন করেন। ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাঁদের দেখতে পান। তিনি তাঁদের সেখানে অবস্থান ও ইয়াবা সেবনের বিষয়ে ধমক দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের দাবি, নিজেদের পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কা এবং আতঙ্কের কারণে দুই তরুণ তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

গণপতি চক্রবর্তীর চিৎকার বা ছাদে সৃষ্ট শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাঁদেরও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের নতুন বক্তব্য। পুলিশ বলছে, প্রীতিলতার গলা চেপে ধরেন মুগ্ধ এবং আগামীকে নিয়ন্ত্রণ করেন সিদ্ধার্থ। একপর্যায়ে গলায় রশি ও কাপড় ব্যবহারের মাধ্যমে তাঁদের মৃত্যু হয় বলে জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

এরপর মা ও মেয়ের মরদেহ ছাদ থেকে সিঁড়ির কাছে এনে রাখা হয়। আগের বক্তব্যে যেখানে বলা হয়েছিল সিঁড়িতেই তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল, নতুন তথ্য অনুযায়ী হত্যার ঘটনাস্থল ছিল ছাদ। এই পরিবর্তনই তদন্তের স্বচ্ছতা ও ঘটনাক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনজনকে হত্যার পর দুই অভিযুক্ত বাড়ির নিচতলায় যান। সেখানে তাঁরা পুরোনো একটি প্লাস ব্যবহার করে বিদ্যুতের তার কেটে দেন। তাঁদের ধারণা ছিল, বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে সেটি অকার্যকর করা সম্ভব হবে। এরপর ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

পরে বাড়ির ভেতরে থাকা গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী জেগে ওঠে। পুলিশ কমিশনারের নতুন বক্তব্য অনুযায়ী, আয়ুশ অভিযুক্ত সিদ্ধার্থকে দেখে তাঁকে প্রশ্নও করেছিল। শিশুটি বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তাকে কাপড় দিয়ে গলা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ।

এ ঘটনায় হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েও পুলিশের বক্তব্যে পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে পুলিশ জানিয়েছিল, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই তরুণ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। পরে পুলিশ কমিশনার বলেন, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে সিদ্ধার্থের জমিসংক্রান্ত কোনো অসন্তোষ ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ফলে হত্যাকাণ্ডের পেছনে একাধিক কারণ থাকার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বাড়ির জিনিসপত্র এলোমেলো করা এবং অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তদন্তকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করা হয় বলে দাবি পুলিশের। গ্রেপ্তার দুই আসামির জবানবন্দি, ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলিয়ে এখন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।

তবে তদন্তের এই পর্যায়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ঘটনাস্থলের ছাদে পানি জমে যাওয়ার বিষয়টি। বুধবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে পানির ট্যাঙ্ক উপচে পানি পড়ে বলে জানা যায়। এতে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট বা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে।

পুলিশের ব্যাখ্যা, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত সদস্য ভুল করে বাড়ির লাইটের সুইচ চালু করতে গিয়ে পানির মোটরের সুইচও চালু করে ফেলেছিলেন। এর ফলে পানির ট্যাঙ্ক উপচে ছাদে পানি পড়ে। পুলিশ বলছে, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে আলামত নষ্ট করার ঘটনা নয়। তবে ফরেনসিক তদন্তের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের যেকোনো পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পানি পড়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশের দেওয়া বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে পার্থক্য থাকায় তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে হত্যার সময়, কোন স্থানে কাকে হত্যা করা হয়েছে এবং হত্যার উদ্দেশ্য কী ছিল—এসব মৌলিক বিষয়ে বক্তব্য পরিবর্তিত হওয়ায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। গত কয়েক দিনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে দ্রুত বিচার এবং প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

এরই মধ্যে মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে গোয়েন্দা বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অধিকতর স্বচ্ছতা ও দ্রুত তদন্তের লক্ষ্যেই তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

একটি পরিবারের চারজন মানুষের এমন নির্মম মৃত্যু রংপুরের মানুষের মধ্যে গভীর শোক ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে এবং কিশোর ছেলে—একই পরিবারের চারটি জীবন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে থেমে যাওয়ার ঘটনায় স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয়রাও শোকাহত।

তদন্তে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আদালতে দেওয়া জবানবন্দির প্রতিটি তথ্য কতটা বাস্তব প্রমাণের সঙ্গে মেলে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সময় ও স্থান, ঘটনার ধারাবাহিকতা, সম্ভাব্য উদ্দেশ্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া জরুরি। কারণ পুলিশের বক্তব্যে পরিবর্তন ও ঘটনাস্থল নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর সমাধান না হলে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নিয়ে জনমনে সংশয় থেকেই যেতে পারে।

পুলিশ বলছে, তদন্ত চলছে এবং প্রাপ্ত তথ্য ও আলামত যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে। এখন সবার নজর তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের দিকে। চারটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনাই এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত