গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল ব্যয় ৬০ হাজার কোটি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
গাবতলী-নারায়ণগঞ্জ মেট্রোরেল ব্যয় ৬০ হাজার কোটি

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে এবং পুরান ঢাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাকে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে নতুন একটি মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘এমআরটি লাইন-২’ নামে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটে ২৪টি স্টেশন রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানীর পশ্চিমাংশের গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যাতায়াতের ক্ষেত্রে গণপরিবহনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে এটি ঢাকার বিদ্যমান ও নির্মাণাধীন অন্যান্য মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে একটি সমন্বিত মেট্রো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-২-এর মূল রুট গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত। এই পথে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা যুক্ত হবে। এর মধ্যে ঢাকা উদ্যান, বসিলা, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাপ্তানবাজার ও ডেমরাসহ বিভিন্ন এলাকা রয়েছে। পরিকল্পিত রুটের শেষাংশ নারায়ণগঞ্জের দিকে এগিয়ে যাবে।

এই প্রকল্পের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এতে উড়াল ও পাতাল—দুই ধরনের অবকাঠামো রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় ভূমির সীমাবদ্ধতা, সড়কের ওপর চাপ এবং বিদ্যমান স্থাপনার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কোথাও পাতাল এবং কোথাও উড়ালপথ ব্যবহার করা হবে। ফলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শুধু একটি নতুন মেট্রোরেল লাইন নয়, বরং রাজধানীর জটিল নগর পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো গড়ে উঠবে।

এমআরটি লাইন-২-এর সঙ্গে অন্য মেট্রোরেল লাইনগুলোর আন্তঃসংযোগও রাখা হয়েছে পরিকল্পনায়। গাবতলী এলাকায় এমআরটি লাইন-৫-এর সঙ্গে সংযোগের সুযোগ থাকবে। কমলাপুর এলাকায় এমআরটি লাইন-১, এমআরটি লাইন-৪ ও এমআরটি লাইন-৬-এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। আবার সাইনবোর্ড এলাকায় এমআরটি লাইন-৪-এর সঙ্গে সংযোগ তৈরি হবে। ফলে যাত্রীরা এক লাইন থেকে অন্য লাইনে স্থানান্তরের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে তুলনামূলক সহজে যেতে পারবেন।

এ প্রকল্পের আওতায় গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। পুরান ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল বাণিজ্যিক অঞ্চল সদরঘাটকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হলে ওই এলাকার মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ পুরান ঢাকা ও সদরঘাট এলাকায় যাতায়াত করেন। সড়কনির্ভর পরিবহনের ওপর চাপ কমাতে এই শাখা লাইন ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বড় একটি অংশ বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তার জন্য সংস্থাটির কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক বা এআইআইবির সঙ্গেও অর্থায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংস্থাটি প্রকল্পে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তবে এখনো প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন হয়নি। বর্তমানে প্রাক-প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব বা পিডিপিপি পর্যালোচনা করছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের মতামত ও যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানো হবে। এরপর উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সমীক্ষা এবং পরবর্তী ধাপের কাজ শুরু হবে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা ডিএমটিসিএল প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে প্রকল্পের কাজ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩০ সালের মধ্যে এই রুটে মেট্রোরেল চলাচল শুরু করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে এত বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন, সমীক্ষা, নকশা, ভূমি অধিগ্রহণ, নির্মাণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনুমোদনের ওপর বাস্তব সময়সূচি নির্ভর করবে।

এমআরটি লাইন-২-এর সবচেয়ে বড় গুরুত্বের জায়গা হলো এর রুট নির্বাচন। প্রস্তাবিত লাইনটি শুধু আবাসিক এলাকা নয়, পুরান ঢাকার মতো ঐতিহাসিক ও প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চলকেও যুক্ত করবে। পুরান ঢাকার সরু ও ব্যস্ত সড়ক, অতিরিক্ত যানবাহন এবং প্রতিদিনের বিপুল যাত্রীচাপের কারণে সেখানে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনের প্রয়োজন দীর্ঘদিনের। মেট্রোরেল চালু হলে এসব এলাকার মানুষের যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি সড়ক পরিবহনের ওপর চাপও কমতে পারে।

একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জকে ঢাকার মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টিও প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজধানীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যাপক। কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে দুই এলাকার মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত চলাচল করেন। দ্রুতগতির গণপরিবহন চালু হলে এই আন্তঃনগর যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে। যদিও এটি বর্তমানে মূল প্রকল্পের অংশ হিসেবে চূড়ান্ত নয়, ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলে ঢাকার আশপাশের আরও বিস্তৃত অঞ্চলকে গণপরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পথ তৈরি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের নথিতেও এমআরটি লাইন-২ নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ, প্রকল্পটি শুধু রেললাইন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, পরিচালনা ও ভবিষ্যৎ মেট্রো নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার মতো বড় ব্যয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণের শর্ত, প্রকল্প ব্যয়ের যৌক্তিকতা, নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং ভবিষ্যৎ পরিচালন ব্যয়—সবকিছুই প্রকল্পের সাফল্যের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বেড়ে গেলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

তবু যানজট, জনসংখ্যার চাপ এবং ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারণের বাস্তবতায় মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণকে নগর পরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমআরটি লাইন-২ বাস্তবায়িত হলে গাবতলী, পুরান ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগের পাশাপাশি বিদ্যমান মেট্রো নেটওয়ার্কের সঙ্গে একটি নতুন গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হবে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করে পরিকল্পনাটিকে বাস্তব নির্মাণকাজে নিয়ে যাওয়া এবং নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত