কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে ‘লেক আমেরিকা’ ট্রাম্পের

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে সীমান্তবর্তী লেক ওন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বৃহস্পতিবার স্বাক্ষর করা এক নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সংস্থাগুলোকে দেশটির সব ধরনের সরকারি নথিপত্রে নতুন নাম ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

লেক ওন্টারিও উত্তর আমেরিকার পাঁচটি বৃহৎ হ্রদ বা গ্রেট লেকসের একটি এবং এর একাংশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তজুড়ে অবস্থিত। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও আলোচনায় এনেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই নির্দেশ কানাডা সরকার বা দেশটির সাধারণ নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের মূল নির্দেশনা হলো, মার্কিন সরকারি সংস্থাগুলো তাদের আনুষ্ঠানিক নথিপত্র ও সরকারি যোগাযোগে লেকটির নাম ‘লেক আমেরিকা’ হিসেবে ব্যবহার করবে। এর আগে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে শুধু ভৌগোলিক নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। কানাডার সঙ্গে শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি নিয়ে চলমান বিরোধের প্রেক্ষাপটে এটি তাঁর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক অবস্থানেরই আরেকটি প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও প্রতিবেশীদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে এলেও এর বিনিময়ে যথেষ্ট সুবিধা পাচ্ছে না। লেক ওন্টারিওর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বলার সময়ও তিনি কানাডার সঙ্গে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।

ওভাল অফিসে নির্বাহী আদেশে সই করার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো অর্থ ছাড়াই কানাডাকে রক্ষা করে। তিনি বলেন, কানাডা মার্কিন সামরিক সুরক্ষার সুবিধা পেলেও এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পর্যাপ্ত অর্থ দেয় না। একই প্রসঙ্গে তিনি মার্কিন আইসব্রেকার বা বরফভাঙা জাহাজ কেনার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন ১১টি আইসব্রেকার আসছে এবং কানাডাও সেগুলো ব্যবহারের সুযোগ চায়। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, কানাডা বিভিন্ন সুবিধা নিলেও তার জন্য যথেষ্ট অর্থ প্রদান করছে না।

তিনি কানাডার অটোমোবাইল শিল্প নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, গাড়ি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কারখানাগুলো আরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা উচিত। এর মাধ্যমে মার্কিন শিল্প ও কর্মসংস্থান শক্তিশালী করার পাশাপাশি কানাডার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছেন তিনি।

কানাডার সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনার ব্যর্থতাও ট্রাম্পের ক্ষোভের অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করার পর অটোয়া পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প কানাডার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, আলোচনার সময় কানাডার কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন এবং বাণিজ্য আলোচনার ক্ষেত্রে কানাডাকে সবচেয়ে কঠিন দেশগুলোর একটি বলে অভিহিত করেন।

লেক ওন্টারিওর নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনার ইঙ্গিত ট্রাম্প আগেই দিয়েছিলেন। টিকটকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি গ্রেট লেকসের একটি মানচিত্র দেখিয়ে জানান, লেকটির নাম বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ভিডিওতে তিনি মানচিত্রে ‘লেক ওন্টারিও’ নামের ওপর ‘লেক আমেরিকা’ লিখে দেখান।

তবে নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মার্কিন সরকারি নথিতে ব্যবহৃত নাম নির্ধারণ করতে পারেন, কিন্তু কানাডার ভূখণ্ড বা কানাডার সরকারি ব্যবহারে প্রচলিত নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা তাঁর নেই। ফলে দুই দেশের সরকারি ও সাধারণ ব্যবহারে হ্রদটির ভিন্ন নাম বজায় থাকার সম্ভাবনাই বেশি।

ট্রাম্পের কানাডা-নীতি অবশ্য শুধু বাণিজ্য বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা বলেছেন। এসব মন্তব্য কানাডায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে এবং দুই দেশের ঐতিহ্যবাহী সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

একই সময়ে ট্রাম্প ন্যাটোর মিত্র ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এ লক্ষ্য অর্জনে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

কানাডার ক্ষেত্রেও ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, ভূখণ্ড এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন। তাঁর প্রশাসনের দৃষ্টিতে উত্তর আমেরিকার উত্তরাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এদিকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক শুল্ক, শিল্প উৎপাদন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের মতো বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে লেক ওন্টারিওর মতো একটি যৌথ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তও বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ধরনের পদক্ষেপ তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং মার্কিন সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক বার্তা তিনি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের মাধ্যমে তুলে ধরছেন।

তবে কানাডার দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য অস্বস্তিকর। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে এবং দুই দেশের অর্থনীতি গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বাণিজ্য ও যোগাযোগও এই সম্পর্কের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।

ফলে লেক ওন্টারিওর নাম ‘লেক আমেরিকা’ করার মার্কিন নির্দেশ বাস্তবে হ্রদটির প্রচলিত আন্তর্জাতিক পরিচয় বদলে দিতে না পারলেও এটি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের বর্তমান উত্তেজনার একটি প্রতীকী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের মতপার্থক্য যত বাড়ছে, ততই এমন প্রতীকী পদক্ষেপের রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত