ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় নতুন বাধা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
ভারতের পরমাণু বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় নতুন বাধা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আগামী দুই দশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১০ গুণ বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছে ভারত। কার্বন নিঃসরণ কমানো, বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথেই নতুন একটি regulatory বাধা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিদেশি প্রযুক্তিতে তৈরি পারমাণবিক চুল্লি ভারতে স্থাপনের ক্ষেত্রে কঠোর অনুমোদন প্রক্রিয়ার বিধান রেখে সম্প্রতি একটি খসড়া নীতিমালা সামনে এনেছে নয়াদিল্লি। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত শর্তগুলো বহাল থাকলে বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রযুক্তি ভারতে দ্রুত ব্যবহারের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। এই বিশাল সক্ষমতা তৈরিতে প্রায় ২১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। বর্তমানে ভারতের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনতে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে দেশটির সরকার।

ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। গত বছর নতুন পরমাণু আইন প্রণয়নের মাধ্যমে খাতটি বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য আংশিকভাবে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি, মূলধন ও দক্ষতা ব্যবহার করে দ্রুত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।

নতুন আইনের পর দেশটির পারমাণবিক খাতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আগ্রহও বাড়ে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত খসড়া বিধিমালার কয়েকটি শর্ত সেই আগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগের পরিবেশ শুধু আইন খোলার ওপর নির্ভর করে না; প্রযুক্তি অনুমোদন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়, দায়বদ্ধতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর পূর্বানুমেয়তাও বড় বিষয়।

খসড়া বিধিমালায় বিদেশি নকশায় তৈরি কোনো পারমাণবিক চুল্লি ভারতে স্থাপনের আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমোদনের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নকশাকে প্রথমে উৎপত্তি দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পেতে হবে। একই সঙ্গে ওই নকশার চুল্লি উৎপত্তি দেশ অথবা অন্য কোনো দেশে বাস্তবে চালু থাকার শর্তও রাখা হয়েছে। এর বাইরে ভারতে নির্মাণকাজ শুরুর আগে দেশটির পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকেও পৃথক নকশা অনুমোদন নেওয়ার প্রয়োজন হবে।

নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে পারমাণবিক চুল্লির নকশা ও পরিচালনা নিয়ে কঠোর যাচাই গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব সাধারণ শিল্পকারখানার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন অপরিহার্য। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ হলো, একই প্রযুক্তির জন্য একাধিক পর্যায়ে অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বাড়িয়ে দিতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষ করে ছোট মডুলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর প্রযুক্তি নিয়ে এই উদ্বেগ বেশি। এসএমআরকে ভবিষ্যতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রচলিত বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় ছোট আকারের এসব রিঅ্যাক্টর তুলনামূলকভাবে কম ক্ষমতার ইউনিট হিসেবে তৈরি করা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ইউনিট স্থাপনের সুযোগ থাকতে পারে।

কিন্তু বিশ্বের অনেক এসএমআর নকশা এখনো বাণিজ্যিক ব্যবহারের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট নকশার চুল্লি অন্য দেশে বাস্তবে চালু থাকার শর্ত থাকলে নতুন প্রযুক্তির ভারতে প্রবেশ বিলম্বিত হতে পারে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে ভারত নতুন পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রথম সারির বাজার হওয়ার সুযোগ হারাতে পারে।

ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ রয়েছে। টাটা পাওয়ার, আদানি পাওয়ার ও রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় ভারতীয় কোম্পানি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার রোসাটম, ফ্রান্সের ইডিএফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জিই হিটাচির মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ভারতীয় বাজারে আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে খসড়া বিধিমালার চূড়ান্ত রূপ না পাওয়া পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে সতর্কতা থাকা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একটি প্রকল্প পরিকল্পনা, অনুমোদন, নির্মাণ ও উৎপাদনে যেতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। তাই শুরুতেই নিয়ন্ত্রক কাঠামো স্পষ্ট না হলে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি নিতে চাইবে না।

ভারতের সরকারি পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি। দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতের প্রধান প্রতিষ্ঠান এনপিসিআইএল ইতোমধ্যে ২০৩২ সালের মধ্যে প্রায় ১৪ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে ২০৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ গিগাওয়াট সক্ষমতায় পৌঁছানো বর্তমান কর্মসূচির তুলনায় অনেক বড় লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু সরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট হবে না। বেসরকারি খাতের মূলধন, বিদেশি প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন হবে। ফলে একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা ভারতের জন্য বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতের বিদ্যুৎ চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং মানুষের জীবনযাত্রায় বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে দেশটির নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন আরও বাড়বে। একই সঙ্গে কয়লাভিত্তিক উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিবেশগত চাপ তৈরি করছে। সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটলেও সারা বছর স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পারমাণবিক শক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ কারণে ভারতের ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক সক্ষমতার লক্ষ্য শুধু একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা নয়; এর সঙ্গে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পনীতি এবং জলবায়ু নীতিও জড়িত। কিন্তু পরিকল্পনার পরিসর যত বড়, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও তত বেশি।

খসড়া বিধিমালার শর্তগুলো তাই ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা তৈরি করেছে। নিরাপত্তা মান বজায় রেখে কীভাবে বিদেশি প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করা যায় এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত খসড়া নীতিমালার চূড়ান্ত রূপ কী হয়, সেটিই ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচির গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। যদি অনুমোদন প্রক্রিয়া অতিরিক্ত দীর্ঘ ও জটিল হয়, তাহলে বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের অংশগ্রহণ ধীর হতে পারে। আবার নিরাপত্তা শিথিল না করে কার্যকর ও পূর্বানুমেয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা গেলে ভারতের বিশাল পারমাণবিক বিদ্যুৎ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ অনেকটাই সহজ হতে পারে। এখন দেশটির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ—দুই দিকের প্রয়োজনকে একই সঙ্গে সামলে এগিয়ে যাওয়া।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত