খেলাপি ঋণ আদায়ে ৫ ব্যাংকের ১০ হাজার মামলা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৪ বার
খেলাপি ঋণ আদায়ে ৫ ব্যাংকের ১০ হাজার মামলা

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

খেলাপি ঋণ আদায়ে একীভূত হওয়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১০ হাজার মামলা করেছে। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যেই এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও যেসব ঋণ আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা প্রয়োজন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে ব্যাংক রেজল্যুশন ডিপার্টমেন্টের (বিআরডি) এক সভায় একীভূত ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় ও পুনর্গঠন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় খেলাপি ঋণ আদায়, মামলা নিষ্পত্তি, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন এবং কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

একীভূত পাঁচটি ব্যাংকের পুনর্গঠন কার্যক্রম বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। ব্যাংকগুলোর আগের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার সময়কার কার্যক্রমও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি এবং ব্যাংকের সম্পদ অপব্যবহারের অভিযোগগুলো যাচাই করতে ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করার এই অডিট এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।

খেলাপি ঋণ আদায়ে শুধু প্রচলিত আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প পদ্ধতিও গ্রহণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে এক্সিট পলিসি এবং অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজল্যুশন বা এডিআর। সমঝোতাভিত্তিক এসব পদ্ধতির মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংকের মধ্যে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করে আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন আদালতে চলা মামলার তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ দ্রুত ফল দিতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

ব্যাংক খাতের জন্য খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। কোনো ঋণ সময়মতো আদায় না হলে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে একীভূত ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ আটকে থাকা অর্থ উদ্ধারকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ছয় মাসে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালকদের প্রাধান্য দিয়ে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি গত ১৬ জুলাই নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন পরিচালনা কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাংকটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদমর্যাদা, দায়িত্ব এবং সাংগঠনিক কাঠামোর প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের কাজও চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাঁচটি পৃথক ব্যাংকের জনবলকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা সহজ কোনো প্রশাসনিক কাজ নয়। দায়িত্বের পুনর্বণ্টন, পদমর্যাদার সামঞ্জস্য এবং সাংগঠনিক কাঠামোর সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন ব্যাংকটির কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একীভূতকরণের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সমন্বয়। পাঁচটি ব্যাংকের আলাদা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা একত্র করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় নিয়ে আসার কাজ চলছে। এর মধ্যে কোর ব্যাংকিং সিস্টেম বা সিবিএস, সুইফট এবং আরএমএসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অবকাঠামো রয়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা এবং গ্রাহকদের জন্য দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত এই সমন্বয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আমানতকারীদের জন্যও একীভূত ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাঁচটি ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে যাতে আমানতকারীরা তাঁদের অর্থ তুলতে পারেন, সে জন্য একটি কমন ইন্টারফেস চালুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে আলাদা পাঁচটি ব্যাংকের পরিবর্তে একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে গ্রাহকসেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শুধু প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ নয়, শাখা ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। শাখাগুলোর অবস্থান, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, গ্রাহকসেবা এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় প্রায় ৭৮০টি শাখা এবং ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসায়িক ইউনিটের একীভূতকরণ ও পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। একই এলাকায় একাধিক শাখার প্রয়োজনীয়তা, পরিচালন ব্যয় এবং গ্রাহকদের সেবা পাওয়ার সুবিধা বিবেচনা করে এই পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য কেবল পাঁচটি ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো একত্র করা নয়; বরং একটি কার্যকর, সুশাসিত এবং আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়ানো গেলে ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থ পুনরুদ্ধার হবে। সেই অর্থ আবার উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করা সম্ভব হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে প্রায় ১০ হাজার মামলা পরিচালনা এবং দ্রুত নিষ্পত্তি করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকঋণসংক্রান্ত মামলায় ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, বন্ধক রাখা সম্পত্তির মালিকানা, সম্পদের মূল্য এবং বিভিন্ন আইনি জটিলতা সামনে আসতে পারে। ফলে শুধু মামলা দায়ের করলেই অর্থ দ্রুত ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। মামলার কার্যকর অনুসরণ, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই প্রচলিত মামলার পাশাপাশি সমঝোতাভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকলে সেটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে একদিকে মামলার চাপ কমতে পারে, অন্যদিকে ব্যাংক দ্রুত তার পাওনা অর্থের একটি অংশ বা পুরো অর্থ উদ্ধারের সুযোগ পেতে পারে।

অন্যদিকে আগের ব্যবস্থাপনায় সংঘটিত অনিয়মের বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকের অর্থ কীভাবে বিতরণ করা হয়েছিল, ঋণ অনুমোদনের সময় যথাযথ যাচাই হয়েছিল কি না, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নিয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফরেনসিক অডিটের ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনিয়মের সঙ্গে কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পথও তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজল্যুশন ডিপার্টমেন্ট নিয়মিতভাবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুনর্গঠন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। ঋণ আদায় ও মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শাখা ও ব্যবসায়িক ইউনিট পুনর্বিন্যাস এবং প্রযুক্তিগত একীভূতকরণের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

একীভূত পাঁচ ব্যাংকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন আটকে থাকা ঋণ উদ্ধার করা গেলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে পরিচালন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তিগত সমন্বয় এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে নতুন কাঠামোর ব্যাংকটি আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাবে।

প্রায় ১০ হাজার মামলা তাই শুধু ঋণ আদায়ের আইনি পদক্ষেপ নয়; এটি একীভূত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব মামলার কত দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, কত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়—তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে নতুন ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত