আলতালেনা নিয়ে নেতানিয়াহু-বেন গভিরের দ্বন্দ্ব

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৬ বার
আলতালেনা নিয়ে নেতানিয়াহু-বেন গভিরের দ্বন্দ্ব

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইসরাইলের রাজনীতিতে প্রায় আট দশক আগের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ডুবে যাওয়া অস্ত্রবাহী জাহাজ ‘আলতালেনা’ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে। পুরোনো এই ঘটনাকে ঘিরে দুই নেতার পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায়কে সামনে আনেনি, বরং বর্তমান ইসরাইলি রাজনীতিতে ক্ষমতার সমীকরণ, আদর্শিক অবস্থান এবং উগ্র ডানপন্থি ভোটের গুরুত্বও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

সোমবার আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দেন বেন-গভির। তার ঘোষণার পরপরই বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। পরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও ঘটনাস্থলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানে গিয়ে আলতালেনার ইতিহাস তুলে ধরেন। দুই নেতা একই বিষয়কে কেন্দ্র করে আলাদা ভিডিও বার্তা দেওয়ায় তাদের মধ্যকার রাজনৈতিক দূরত্ব নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

আলতালেনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শুরুর সময়ের এক গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধ। ১৯৪৮ সালের জুনে ফ্রান্স থেকে ইরগুনের জন্য বিপুল অস্ত্র নিয়ে ইসরাইলে আসে জাহাজটি। সে সময় ইরগুন ছিল একটি ইহুদি আধাসামরিক সংগঠন, যা ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল। একই সময়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘাতও দ্রুত তীব্র হয়ে উঠছিল।

জাহাজটিতে থাকা অস্ত্র কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়ে ইরগুন এবং নবগঠিত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। নবগঠিত রাষ্ট্রের নেতৃত্ব চেয়েছিল দেশের সব সশস্ত্র বাহিনীকে একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর অধীনে আনতে। অন্যদিকে ইরগুনের নেতৃত্ব তাদের নিজস্ব অস্ত্র ও সংগঠনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চেয়েছিল। এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নেয় এবং ডেভিড বেন-গুরিয়নের নির্দেশে আলতালেনা ডুবিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটি ইসরাইলের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছিল। ইরগুনের নেতা মেনাখেম বেগিন তার অনুসারীদের পাল্টা গুলি না চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে নেতানিয়াহু তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন। পরে বেগিনই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হন এবং তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে বর্তমান লিকুদ দল নিজেদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরে।

নেতানিয়াহুর বক্তব্যে আলতালেনা শুধু অতীতের সামরিক সংঘাত হিসেবে উঠে আসেনি। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও ঘটনাটির তুলনা করেছেন। তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ইসরাইলিদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা প্রয়োজন। দেশের রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে তিনি অতীতের ঘটনাকে বর্তমানের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবেও উপস্থাপন করেন।

অন্যদিকে বেন-গভিরের অবস্থানও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলের ডানপন্থি ও কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ। আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি এমন একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় সামনে এনেছেন, যার সঙ্গে ইসরাইলের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং লিকুদের ঐতিহাসিক শিকড় গভীরভাবে যুক্ত।

তবে আলতালেনার ইতিহাস শুধু ইসরাইলের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাহিনি নয়; এর সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি, সহিংসতা এবং ১৯৪৮ সালের নাকবার ইতিহাসও জড়িয়ে আছে। ইরগুনসহ বিভিন্ন ইহুদি আধাসামরিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড সেই সময়ের সংঘাতকে আরও রক্তাক্ত করে তোলে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন। ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করেন।

এর কয়েক মাস আগে, ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে জেরুজালেমের কাছে দেইর ইয়াসিন গ্রামে ইরগুন ও লেহির সদস্যদের হামলার ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। নারী ও শিশুসহ বহু গ্রামবাসী নিহত হন। ওই ঘটনা ফিলিস্তিনি সমাজে আতঙ্ক তৈরি করে এবং বাস্তুচ্যুতির প্রক্রিয়ায় এর প্রভাব ছিল বলে ইতিহাসবিদদের একটি অংশ মনে করেন। একইভাবে জাফায় ইরগুনের সামরিক অভিযানও সেখানকার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

ইরগুনের কর্মকাণ্ড অবশ্য শুধু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ছিল না। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধেও সংগঠনটি সশস্ত্র অভিযান চালিয়েছে। ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমের কিং ডেভিড হোটেলে বোমা হামলায় ৯০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা ইরগুনের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি।

তবে ১৯৪৮ সালের নাকবার দায় শুধু ইরগুনের ওপর দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইয়েহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতো গবেষকদের মতে, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জায়নবাদী আধাসামরিক সংগঠন এবং তৎকালীন লেবার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শক্তিগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফলে আলতালেনাকে ঘিরে ইতিহাসের পাঠ একমাত্রিক নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বিপর্যয়—সবকিছুই জড়িয়ে আছে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় আলতালেনা নিয়ে নতুন করে আগ্রহের আরেকটি কারণ সামনে এসেছে। অক্টোবরের নির্বাচনকে ঘিরে নেতানিয়াহু রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তার দল লিকুদ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির পেছনে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থি ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখা নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বেন-গভিরও এই ভোটব্যাংকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে প্রভাব রাখেন। ফলে আলতালেনার মতো ঐতিহাসিক ও আবেগঘন একটি বিষয় রাজনৈতিকভাবে নতুন তাৎপর্য পেতে পারে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যানিয়েল বার-তালের মতে, আলতালেনাকে ঘিরে বর্তমান আগ্রহের পেছনে নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভূমিকা রয়েছে। তার মতে, অধিকাংশ ইসরাইলি ভোটারের কাছে বিষয়টি দৈনন্দিন রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বার-তালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বেন-গভির আলতালেনার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে নেতানিয়াহুকে কিছুটা রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ফেলেছেন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে রাজি হননি—এ বিষয়টিও রাজনৈতিক বিতর্কে উঠে এসেছে। বেন-গভির তখন নিজেকে মেনাখেম বেগিনের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, অন্যরা যখন তার সঙ্গে একই মঞ্চে ছবি তুলতে চায় না, তখন বেগিনের মতো তিনিও এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন।

চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ইয়োসি মেকেলবার্গের বিশ্লেষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, বেন-গভির যেন নেতানিয়াহুকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তার পর্যবেক্ষণ হলো, দুই নেতাই নিজেদের রাজনৈতিক সমর্থকদের সামনে নিপীড়িত বা অন্যায়ের শিকার হিসেবে তুলে ধরার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

ইসরাইলে রাজনৈতিক বিভাজন ও উত্তেজনা বাড়তে থাকা অবস্থায় গৃহযুদ্ধের আশঙ্কার মতো শব্দ ব্যবহার করাকে মেকেলবার্গ রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ হিসেবে দেখলেও তিনি এ ধরনের বক্তব্যকে বিপজ্জনক বলে সতর্ক করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক সংকটের অনুভূতি দীর্ঘস্থায়ী করে নিজেদের সেই সংকট থেকে দেশকে উদ্ধারের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির একটি পরিচিত কৌশল।

১৯৯৫ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিন হত্যার আগে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশে উসকানিমূলক বক্তব্য ও তীব্র মেরুকরণের যে আবহ তৈরি হয়েছিল, সেটিও এই প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। মেকেলবার্গের মতে, অতীতের এমন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র করা হলে তা ভবিষ্যতে গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে, আলতালেনার ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া নিছক একটি পুরোনো জাহাজের ইতিহাস উদ্ধার নয়। প্রায় আট দশক আগের একটি সংঘাত আজকের ইসরাইলি রাজনীতিতে নতুন প্রতীকী অর্থ পেয়েছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়কার অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ফিলিস্তিনিদের নাকবার স্মৃতি, লিকুদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং বর্তমান ডানপন্থি রাজনীতির প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সবকিছু মিলিয়ে আলতালেনা আবারও ইসরাইলের রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে এসেছে। সামনে নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ঘিরে নেতানিয়াহু ও বেন-গভিরের অবস্থান কতটা রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে, সেটিই এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত