ঢাকার তিন বস্তিতে চীনের ১০ হাজার কোটি বিনিয়োগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৭ বার
ঢাকার তিন বস্তিতে চীনের ১০ হাজার কোটি বিনিয়োগ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর গুলশান ও ঢাকা-১৭ এলাকার কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের জন্য আধুনিক আবাসন নির্মাণে চীনের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবটিতে প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে চীন। পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান। এর আগে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে রাজধানীর বস্তি উন্নয়ন, আবাসন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।

প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল লক্ষ্য রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা বস্তিবাসীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক আবাসনের ব্যবস্থা করা। বর্তমানে কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ বসবাস করছেন। এসব এলাকার অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জীবনযাপন করছে। অপরিকল্পিত ঘরবাড়ি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিঝুঁকিসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় তাদের।

মীর শাহে আলম বলেন, কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেকের বাসিন্দাদের জন্য বিনামূল্যে আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব চীনকে দেওয়া হয়েছে। চীন এতে প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। বর্তমানে যেসব মানুষ ওই তিনটি বস্তিতে বসবাস করছেন, তাদের সবার আবাসনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।

রাজধানীর কড়াইল বস্তি দেশের অন্যতম বড় অনানুষ্ঠানিক বসতি হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা নিম্নআয়ের মানুষের একটি বড় অংশ এখানে বসবাস করছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গৃহকর্মী, পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নির্মাণশ্রমিকসহ নানা পেশায় যুক্ত মানুষের জন্য কড়াইল ও আশপাশের বস্তিগুলো আবাসনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব এলাকায় বসবাসের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে।

একইভাবে সাততলা ও ভাষানটেক এলাকার অনেক পরিবারও বছরের পর বছর ধরে সীমিত আয় নিয়ে বসবাস করছে। পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা হলে এসব মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমান বাসিন্দাদের পুনর্বাসন, জমির ব্যবহার, আবাসনের নকশা, অবকাঠামো, মালিকানা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

১০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে শুধু আবাসন নয়, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর সড়ক, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার উন্নয়নেও সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটির অর্থায়নের কাঠামো, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। চীনের বিনিয়োগ কী ধরনের আর্থিক কাঠামোর আওতায় হবে, সে বিষয়েও পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

বৈঠকে শুধু আবাসন নয়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও চীনের আগ্রহের কথা উঠে এসেছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে জমা ময়লা-আবর্জনা ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনের একটি কোম্পানি বিনিয়োগ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দেড় বছরের মধ্যে বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই প্রকল্পের বিদ্যুৎ ২০২৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। এ বিষয়ে আগামী ২ সেপ্টেম্বর চীনে একটি ত্রিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে ঢাকার দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট মোকাবিলায় নতুন একটি উদ্যোগের সূচনা হতে পারে।

রাজধানীতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ বিভিন্ন ল্যান্ডফিলে গিয়ে জমা হয়। দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমতে থাকায় ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ বাড়ছে। পাশাপাশি পরিবেশ, দুর্গন্ধ, মাটি ও পানিদূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সেই বর্জ্যকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কাজে ব্যবহার করা গেলে একদিকে যেমন বর্জ্যের পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বিকল্প উৎসও তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় আবাসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করা শুধু সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, এটি নগর পরিকল্পনার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একইভাবে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার উদ্যোগ পরিবেশগত চাপ কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও কার্যকর হতে পারে।

তবে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে বস্তিবাসীদের জন্য আবাসন প্রকল্পে প্রকৃত বাসিন্দারা যেন সুবিধা পান, সেটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন নির্মাণের পর তাদের সেখানে থাকার অধিকার, সেবা পাওয়ার সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার কাঠামো স্পষ্ট না হলে প্রকল্পের সামাজিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেকের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আধুনিক আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর নগর চেহারাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। অপরিকল্পিত বসতি থেকে পরিকল্পিত আবাসনে স্থানান্তরের মাধ্যমে নিরাপদ বসবাসের পরিবেশ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নাগরিক সেবার আওতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা নিম্নআয়ের পরিবারগুলো একটি স্থায়ী আবাসনের সম্ভাবনা দেখতে পারে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। নতুন এই আবাসন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ সেই সহযোগিতার আরেকটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে সামনে এসেছে। তবে প্রস্তাব থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যথাযথ পরিকল্পনা, পরিবেশগত মূল্যায়ন, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রস্তাবিত ১০ হাজার কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প এবং আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে ৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান ও নগর ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এখন অপেক্ষা প্রকল্পগুলোর আনুষ্ঠানিক কাঠামো, চুক্তি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার। শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং এর সুফল কতটা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত