প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত চিত্রনায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দায়ের করা হত্যা মামলায় নতুন করে তদন্তের গতি তৈরি হয়েছে। এ মামলায় গ্রেপ্তার অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনার পেছনের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা শুনানি শেষে ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে সকালে তাকে কারাগার থেকে আদালতের হাজতখানায় নেওয়া হয়। পরে নির্ধারিত শুনানিতে মামলার তদন্তকারী সংস্থা সিআইডির পক্ষ থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান আদালতে ডনকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। শুনানিতে তদন্তের স্বার্থে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। শুনানি শেষে আদালত সাত দিনের পরিবর্তে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্তে আশরাফুল হক ওরফে ডনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে।
তদন্তকারীদের ধারণা, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই মামলার বিভিন্ন বিষয় নতুন করে যাচাই করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে সালমান শাহের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ওই সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তদন্তের গতিপথ আরও স্পষ্ট হতে পারে। সেই লক্ষ্যেই ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে সিআইডি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তার মতে, ডনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলায় জড়িত অন্য সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত এবং তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হতে পারে। তদন্তকারীরা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনার বিষয়ে তথ্য যাচাই করতে পারেন। তবে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে সালমান শাহ ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন অভিনেতা। নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রে তার আবির্ভাবের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। অভিনয়, পোশাক, ব্যক্তিত্ব ও পর্দায় উপস্থিতির কারণে তিনি তরুণ প্রজন্মের কাছে আলাদা জায়গা করে নেন। ক্যারিয়ারের স্বল্প সময়ে একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি ঢালিউডের অন্যতম আলোচিত তারকা হয়ে ওঠেন।
তবে তার আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে গভীর শোকের পাশাপাশি নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন থেকেই তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়। এক পক্ষ ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে হত্যার অভিযোগ করে আসা হয়েছে। ফলে সালমান শাহের মৃত্যু বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত অমীমাংসিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে দীর্ঘ সময় ধরে জনমনে আগ্রহ তৈরি করে রেখেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘটনা নিয়ে একাধিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া হয়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ে তদন্তের ফলাফল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সালমান শাহের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে প্রশ্ন পুরোপুরি থামেনি। তার পরিবার, ভক্ত ও চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই বিষয়টি এখনো আবেগ ও কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
এ অবস্থায় হত্যা মামলায় ডনের গ্রেপ্তার এবং তাকে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনা মামলার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দীর্ঘ সময় পর একজন পরিচিত অভিনেতাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ফলে তদন্তে এবার কী ধরনের তথ্য উঠে আসে, সেদিকে নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।
আইনগতভাবে রিমান্ড কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করে না। তদন্তের প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো আসামি বা সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। ডনের ক্ষেত্রেও আদালত পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের অনুমতি দিয়েছেন। এই সময়ে তদন্ত কর্মকর্তারা মামলার বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানতে চাইবেন।
সিআইডির দাবি, মামলার তদন্তকে এগিয়ে নিতে ডনের জিজ্ঞাসাবাদ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে তার কাছ থেকে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, যা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সহায়তা করবে, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তকারীরা তার বক্তব্যের সঙ্গে মামলার নথি, পূর্ববর্তী তদন্তের তথ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামত মিলিয়ে দেখবেন।
তবে তদন্তের এই পর্যায়ে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগ ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। ডনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তও এখনো হয়নি। আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
সালমান শাহের মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরও ঘটনাটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে আলোচনার বাইরে যায়নি। সময়ের ব্যবধানে তার চলচ্চিত্রজীবন যেমন কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে, তেমনি তার মৃত্যুর রহস্যও ভক্তদের মনে নানা প্রশ্ন জিইয়ে রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের পর নতুন প্রজন্মের মধ্যেও সালমান শাহের জীবন ও মৃত্যুকে ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এখন ডনের পাঁচ দিনের রিমান্ডে তদন্তকারীরা কী তথ্য পান, সেটিই হয়ে উঠেছে মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নতুন কোনো তথ্য সামনে আসে কি না, অন্য কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত এগোয় কি না কিংবা মামলার দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর মেলে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
তবে এত বছরের আলোচনার পর মামলার তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা শুধু আইনি প্রক্রিয়াতেই নয়, সালমান শাহের অগণিত ভক্তের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একজন জনপ্রিয় তারকার আকস্মিক মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য ও আইনসম্মত নিষ্পত্তিই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান প্রত্যাশা।