প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি কোনো ‘পোষ্য বিরোধী দল’ পাবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, বিএনপির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনার ভিত্তিতে সংসদ কিংবা রাজপথে এনসিপি কোনোদিন কথা বলবে না।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় নোয়াখালী জেলা শহরের মাইজদীতে এনসিপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সাংগঠনিক সমন্বয় সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সারজিস আলম তার বক্তব্যে বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি ‘প্রতারণার রাজনীতি’ শুরু করেছে এবং এর ফল দলটিকে ভোগ করতে হবে। তার ভাষায়, সংসদ থেকে রাজপথ—রাজনীতির প্রতিটি জায়গায় এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে হবে।
বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব নিয়েও সরাসরি মন্তব্য করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, বর্তমান বিএনপি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিএনপি নয় এবং এটি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বিএনপিও নয়। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করেন।
সারজিস আলম বলেন, ২০২৪ সালের আগে অনলাইনে জনগণের পক্ষে কথা বলা তারেক রহমান এবং বর্তমান তারেক রহমান এক ব্যক্তি হলেও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তার অভিযোগ, বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য ক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা।
তিনি দাবি করেন, জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার পর বিএনপি ক্ষমতাকে আরও কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে সংসদ ও রাজপথে বিরোধী দলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার রাজনৈতিক কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এই প্রসঙ্গেই আওয়ামী লীগের অতীত রাজনীতির সঙ্গে বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনা টানেন সারজিস আলম। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একসময় জাতীয় পার্টিকে ‘পোষ্য’ বিরোধী দল হিসেবে পেয়েছিল। কিন্তু ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিএনপি এমন কোনো বিরোধী দল তৈরি করতে পারবে না।
সারজিস আলমের বক্তব্যে এনসিপির অবস্থানও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, বিএনপির প্রেসক্রিপশনে সংসদে কিংবা রাজপথে এনসিপি কোনোদিন কথা বলবে না। তার এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখার বার্তাই দিয়েছেন এনসিপির এই নেতা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিরোধী দলের সম্পর্ক এবং সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। বিশেষ করে কোনো বিরোধী দল সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সারজিস আলমের বক্তব্য সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
তিনি একই সঙ্গে এনসিপির নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান। দলীয় অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য বা নেতৃত্বের প্রশ্নে নিজেদের শক্তি ক্ষয় না করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা বলেন তিনি।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সারজিস আলম বলেন, তাদের লড়াই দীর্ঘ এবং বড়। তাই নিজেদের মধ্যে শক্তি নষ্ট না করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে দলের নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে কেউ জেলা কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে ভবিষ্যতে ছয় মাস, এক বছর কিংবা দুই বছরের মধ্যে জেলার নেতৃত্বে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তার বক্তব্যে দলের তৃণমূল পর্যায়ে যোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে।
নোয়াখালীর সাংগঠনিক সমন্বয় সভাটি এনসিপির স্থানীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন এবং জেলার সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।
কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব নিজাম উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় সদস্য ইমরান হোসাইন তুহিন সভা সঞ্চালনা করেন। এতে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারওয়ার তুষার, যুগ্ম আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিন, রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য ও যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং নোয়াখালী পৌরসভার এনসিপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাজী মাঈন উদ্দিন তানভীর বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া জেলা, উপজেলা এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সারজিস আলমের বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন দেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের মধ্যে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সমীকরণ, জোট এবং সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে। নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির অবস্থানও এ সময় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে।
এনসিপি নিজেদের একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। দলটির নেতারা বিভিন্ন সময়ে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমালোচনা করে নতুন ধরনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। সারজিস আলমের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের নির্ভরশীল রাজনৈতিক সম্পর্ক না রাখার বিষয়ে তার বক্তব্য দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, সারজিস আলম বিএনপির বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তুলেছেন, সেগুলো তার রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ। এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান বা পাল্টা বক্তব্য থাকলে তা সামনে এলে বিতর্কটি আরও বিস্তৃত হতে পারে। রাজনৈতিক বক্তব্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন ও পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কেমন হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং রাজপথের আন্দোলনে বিভিন্ন দলের অবস্থান আগামী দিনের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
সারজিস আলমের বক্তব্য থেকে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট—এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখার বিষয়ে জোর দিচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারা কোনো ধরনের ‘পোষ্য’ বা নিয়ন্ত্রিত বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করবে না—এমনই কঠোর বার্তা দিয়েছেন তিনি।
তার এই বক্তব্য ভবিষ্যতে বিএনপি ও এনসিপির রাজনৈতিক সম্পর্ক কোন দিকে যায়, সে প্রশ্নও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ধরন নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে নজর থাকবে বিএনপির পক্ষ থেকে এই বক্তব্যের কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না এবং এনসিপি ভবিষ্যতে তাদের ঘোষিত স্বতন্ত্র অবস্থান কীভাবে বাস্তবে ধরে রাখে।