প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে আসন্ন রাজ্য নির্বাচন ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন উত্তেজনা। নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি জনমত জরিপে অন্য সব দলকে পেছনে ফেলে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে। দলটি যদি শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির কোনো রাজ্যে প্রথমবারের মতো কট্টর ডানপন্থীদের নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠার পথ খুলে যেতে পারে।
৬ সেপ্টেম্বর স্যাক্সনি-আনহাল্টে ভোট হওয়ার কথা। প্রায় ১৭ লাখ ভোটার নতুন রাজ্য সংসদ নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধি বেছে নেবেন। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে এএফডির ভোটের হার ৪০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফোরশুংসগ্রুপে ভ্যালেনের ১ থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের জরিপে দলটির সমর্থন ৪১ শতাংশ, যেখানে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের নেতৃত্বাধীন খ্রিষ্টীয় গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন বা সিডিইউর সমর্থন ২৩ শতাংশ।
তবে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা মানেই এককভাবে সরকার গঠন নিশ্চিত হওয়া নয়। একই জরিপে দেখা গেছে, এএফডি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজনীয় সীমায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। জরিপ অনুযায়ী, বামপন্থী ডি লিঙ্কে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ, এসপিডি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গ্রিনস ৬ শতাংশ ভোট পেতে পারে। এদিকে এফডিপি ও বিএসডব্লিউ পাঁচ শতাংশের নির্বাচনী সীমা পার করতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত কোন দল সংসদে ঢুকবে এবং আসন বণ্টন কীভাবে হবে, তার ওপর সরকার গঠনের হিসাব অনেকটাই নির্ভর করবে।
এএফডির এই উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছেন দলটির শীর্ষ প্রার্থী উলরিখ সিগমুন্ড। মাত্র ৩৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিক অভিবাসন, জাতীয় পরিচয়, জ্বালানি নীতি এবং সাংস্কৃতিক প্রশ্নকে সামনে রেখে প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এএফডি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। তাঁর যুক্তি, নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, জোট সরকার গঠনের পর আপসের কারণে সেগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সিগমুন্ডের এই অবস্থান জার্মান রাজনীতির দীর্ঘদিনের একটি বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটির মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে এএফডির সঙ্গে জোট বা আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা এড়িয়ে চলেছে। জার্মান রাজনৈতিক পরিসরে এ অবস্থানকে প্রায়ই ‘ফায়ারওয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সিডিইউও এএফডির সঙ্গে জোটে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও অন্য দলগুলো সহযোগিতা না করলে সরকার গঠন করতে তাদের বড় ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হতে হবে।
এবারের নির্বাচনে এএফডির উত্থানের পেছনে অর্থনৈতিক অসন্তোষ, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি হতাশা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পূর্ব জার্মানির অনেক অঞ্চলের মতো স্যাক্সনি-আনহাল্টেও দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা সংকট, শিল্প ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং পুনরেকত্রীকরণের পর সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্মৃতি রাজনৈতিক আচরণে প্রভাব ফেলেছে। এসব অসন্তোষকে এএফডি নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
দলের নির্বাচনী কর্মসূচিতে অভিবাসন ও তথাকথিত ‘রিমিগ্রেশন’ বা প্রত্যাবাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষা, পরিবার, সংস্কৃতি ও জ্বালানি নীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। স্কুলে রংধনু পতাকা না ওড়ানো, জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহ্যকে শিক্ষায় আরও গুরুত্ব দেওয়া এবং বর্তমান জ্বালানি নীতির পরিবর্তনের মতো বিষয়ও তাদের কর্মসূচিতে রয়েছে।
এই নীতিগুলো নিয়ে রাজ্যটির অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে। সম্ভাব্য এএফডি সরকার তাদের জীবন, কাজ ও ভবিষ্যতের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—এ নিয়ে অনেকেই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য খাতে অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে কঠোর অভিবাসন নীতির বাস্তব প্রভাব নিয়েও আলোচনা চলছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচনের ফল তাই শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়, রাজ্যের বহু মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
এএফডির উত্থানকে ঘিরে ইতিহাসের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসি আমলের ভয়াবহতার পর জার্মানির রাজনৈতিক ব্যবস্থা কট্টর জাতীয়তাবাদ ও উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে বিশেষ সতর্ক অবস্থান গড়ে তুলেছে। এএফডির রাজনৈতিক উত্থান সেই ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতাকে আবার সামনে এনেছে। দলটির শিক্ষা ও জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব নিয়ে সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন, এতে জার্মানির অতীতকে দেখার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
নির্বাচনের আগে এএফডির প্রচারণাকে ঘিরে রাশিয়ার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। জার্মান কর্তৃপক্ষ ও গবেষকেরা সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নির্বাচনী পরিবেশ প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তৈরি করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর ঘটনাও শনাক্ত হয়েছে। এসব প্রচারণার সঙ্গে রাশিয়াসংশ্লিষ্ট একটি বৃহত্তর তথ্য-প্রভাব অভিযানের যোগসূত্র থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যেই জার্মানির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়েছে। লেইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে আগস্টে একটি ড্রোন হামলার চেষ্টার ঘটনায় জার্মান সরকার রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছে। জার্মান কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে রুশ রাষ্ট্রীয় সংস্থার হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মস্কো অবশ্য এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনের ঠিক আগে এমন ঘটনাগুলো দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তবে এএফডির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অর্থ এই নয় যে রাজ্যের অধিকাংশ ভোটার দলটির সরকারকে সমর্থন করছেন। সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ ভোটার সিডিইউ নেতৃত্বাধীন সরকারকে পছন্দ করেন, যেখানে ৩৭ শতাংশ এএফডি নেতৃত্বাধীন সরকার চান। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সিডিইউর প্রার্থী ও বর্তমান রাজ্যপ্রধান স্ভেন শুলৎসের পক্ষে ৪৮ শতাংশ এবং সিগমুন্ডের পক্ষে ৩৪ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ দল হিসেবে এএফডি শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও ব্যক্তিগত নেতৃত্বের প্রশ্নে চিত্রটি ভিন্ন।
এই নির্বাচন তাই শুধু স্যাক্সনি-আনহাল্টের জন্য নয়, পুরো জার্মানির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এএফডি যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে, তাহলে যুদ্ধ-পরবর্তী জার্মান রাজনীতির প্রচলিত রাজনৈতিক সীমারেখায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলবে। আর যদি তারা সবচেয়ে বড় দল হয়েও সরকার গঠন করতে না পারে, তাহলেও রাজ্য সংসদে তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি মূলধারার দলগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে।
ফলাফল যাই হোক, স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোট জার্মানির একটি বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট করে দিয়েছে—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি অসন্তোষ এখন আর প্রান্তিক রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়। এসব প্রশ্ন ভোটারদের সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। ফলে ৬ সেপ্টেম্বরের ভোট শুধু একটি রাজ্য সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; জার্মানির রাজনৈতিক মূলধারা কতটা শক্তিশালী এবং কট্টর ডানপন্থার উত্থান কতদূর যেতে পারে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।