প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলা গানের ভুবনে সাবিনা ইয়াসমীনের নাম উচ্চারণ করলেই সামনে ভেসে ওঠে এক দীর্ঘ ও গৌরবময় সংগীতযাত্রার ছবি। দেশাত্মবোধক গান থেকে চলচ্চিত্রের গান, আধুনিক গান থেকে আবেগঘন সুর—দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠ মুগ্ধ করেছে অসংখ্য শ্রোতাকে। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তিনি যেমন কিংবদন্তি, তেমনি তাঁর কণ্ঠের স্বীকৃতি এসেছে দেশের সীমানা পেরিয়েও। ভারতের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরের সামনে গান গেয়ে প্রশংসিত হওয়ার স্মৃতিও তাঁর জীবনের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায়।
সাবিনা ইয়াসমীনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে শৈশবেই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে পেশাদার সংগীতজগতে প্রবেশ করেন তিনি। এরপর সময়ের সঙ্গে তাঁর কণ্ঠ হয়ে ওঠে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংগীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য গান গেয়ে তিনি অর্জন করেছেন জনপ্রিয়তা, সম্মান এবং মানুষের গভীর ভালোবাসা।
তবে তাঁর জীবনের কিছু মুহূর্ত কেবল পুরস্কার বা জনপ্রিয়তার কারণে স্মরণীয় হয়ে নেই। বরং কিংবদন্তি শিল্পীদের কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতি ও ভালোবাসার কারণে সেসব মুহূর্ত হয়ে উঠেছে অমূল্য। তেমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে।
সেবার বাংলাদেশ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে অংশ নিতে মুম্বাই গিয়েছিলেন সাবিনা ইয়াসমীন। বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক ও চলচ্চিত্র প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তিনি ভারত সফর করেন। সেই সফরে তাঁদের যাওয়ার কথা ছিল দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বেশ কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিও সেই দলে ছিলেন।
মুম্বাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে হারমোনিয়াম হাতে গান গাওয়ার সুযোগ পান সাবিনা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সংগীতের আরেক কিংবদন্তি শচীন দেব বর্মণ। সাবিনার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তিনি তাঁকে বাংলাদেশের একটি গান পরিবেশনের অনুরোধ করেন।
শচীন দেব বর্মণের অনুরোধে সাবিনা ইয়াসমীন গেয়ে শোনান ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা’। কোনো বড় বাদ্যযন্ত্রের আয়োজন ছিল না। শুধু হারমোনিয়াম বাজিয়ে গানটি পরিবেশন করেন তিনি। তাঁর কণ্ঠের আবেগ, স্বচ্ছতা ও দরদে মুহূর্তেই যেন বদলে যায় অনুষ্ঠানের পরিবেশ।
সাবিনা গান গাওয়ার সময় শচীন দেব বর্মণ মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। গান শেষ হওয়ার পর তিনি মাথা তুলে তাকান। তখন সাবিনা দেখতে পান, তাঁর চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। গানের আবেগ তাঁকে এতটাই স্পর্শ করেছিল যে নিজের অনুভূতি ধরে রাখতে পারেননি এই বরেণ্য সংগীত পরিচালক। এরপর তিনি সাবিনাকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেন।
এই ঘটনার পর সাবিনার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় এক চমক। তিনি যখন অনুষ্ঠানে আরেকটি গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন করিডোর দিয়ে কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরকে আসতে দেখেন। লতার মতো একজন মহাতারকাকে সামনে দেখে স্বাভাবিকভাবেই নার্ভাস হয়ে পড়েন সাবিনা।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাবিনা জানিয়েছেন, লতা মঙ্গেশকরকে দেখেই তিনি এতটা ভয় পেয়েছিলেন যে হারমোনিয়াম পর্যন্ত ফেলে সেখান থেকে সরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ আর হয়নি। তাঁকে লতা মঙ্গেশকরের সামনেই গান গাইতে হয়।
প্রথমে তিনি পরিবেশন করেন ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো’ গানটি। গান শেষ হওয়ার পর লতা মঙ্গেশকর সাবিনার কণ্ঠ ও গায়কির প্রশংসা করেন। উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পীর মুখে এমন প্রশংসা শুনে স্বাভাবিকভাবেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন সাবিনা। একই সঙ্গে লজ্জা ও বিস্ময়ও তাঁকে ঘিরে ধরেছিল।
সেদিনের অনুষ্ঠানটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছিল ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সংগীতাঙ্গনের বহু খ্যাতিমান ব্যক্তির উপস্থিতিতে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অমিতাভ বচ্চন ও রাজ কাপুরের মতো তারকারাও। সাবিনার গান শুনে রাজ কাপুর তাঁর কণ্ঠের প্রশংসা করে তাঁকে ‘আওয়াজ কি দেবী’ বলে অভিহিত করেছিলেন বলে স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে।
অনুষ্ঠানের আরেকটি স্মরণীয় ঘটনা ছিল শচীন দেব বর্মণের সঙ্গে সাবিনা ও লতা মঙ্গেশকরের একসঙ্গে ছবি তোলা। শচীন দেব বর্মণ দুই পাশে দুই শিল্পীকে দাঁড় করিয়ে তাঁদের জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছিলেন। সেই মুহূর্তটি সাবিনার জীবনের অন্যতম মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে। তোলা তিনটি ছবির মধ্যে একটি এখনো তাঁর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা যায়। অন্য দুটি ছবি অবশ্য পরবর্তী সময়ে আর খুঁজে পাননি তিনি।
সেই সফরে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে সাবিনা ইয়াসমীনের দীর্ঘ কথোপকথনও হয়েছিল। লতা তাঁকে জানিয়েছিলেন, বাংলা গান তাঁর ভালো লাগে। বাংলা ভাষার মাধুর্যও তাঁকে আকৃষ্ট করত। দুই দেশের দুই প্রজন্মের সংগীতশিল্পীর এই সাক্ষাৎ তাই কেবল একজন শিল্পীর অন্য শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় ছিল না; এটি ছিল উপমহাদেশের সংগীত ঐতিহ্যের দুই ধারার এক আবেগঘন মিলন।
সাবিনা ইয়াসমীনের সংগীতজীবনের বিস্তৃতি বিশাল। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, তিনি ১০ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে চলচ্চিত্রের অসংখ্য গান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানেও তিনি তৈরি করেছেন নিজের অনন্য অবস্থান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মাটি, মানুষ ও দেশপ্রেমকে কেন্দ্র করে তাঁর গাওয়া বহু গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রোতাদের আবেগের সঙ্গে মিশে আছে।
‘জন্ম আমার ধন্য হলো’, ‘ও আমার বাংলা তোর’, ‘একটি বাংলাদেশ’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ এবং ‘সেই রেল লাইনের ধারে’র মতো গান তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্মরণীয় কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে। তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা ও দেশপ্রেম—প্রতিটি অনুভূতিই পেয়েছে আলাদা মাত্রা।
চলচ্চিত্রের গানেও সাবিনা ইয়াসমীনের অবদান অসামান্য। ‘এ কী সোনার আলোয়’, ‘প্রেম যেন এক গোধুলি বেলার’, ‘যদি আমাকে জানতে সাধ হয়’, ‘মন যদি ভেঙে যায় যাক’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান’সহ বহু গান শ্রোতাদের কাছে আজও পরিচিত ও প্রিয়। সময় বদলেছে, সংগীতের পরিবেশ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু তাঁর কণ্ঠের আবেদন কমেনি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে আলতাফ মাহমুদের সংগীত পরিচালনায় ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক দিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা তাঁকে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের সংগীতের সর্বোচ্চ সম্মানের জায়গাগুলোর একটিতে। সংগীতে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা। চলচ্চিত্রের গানে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন বহুবার।
তবে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানের পাশাপাশি লতা মঙ্গেশকরের মতো একজন বিশ্বখ্যাত শিল্পীর সামনে গান গেয়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়া নিঃসন্দেহে সাবিনা ইয়াসমীনের জীবনের বিশেষ সম্পদ। আরও আবেগঘন হয়ে ওঠে সেই স্মৃতি, যখন তাঁর গান শুনে শচীন দেব বর্মণের চোখে পানি এসেছিল।
লতা মঙ্গেশকর ২০২২ সালে মারা যাওয়ার পরও সেই সাক্ষাতের স্মৃতি সাবিনা ইয়াসমীনের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। উপমহাদেশের সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের চলে যাওয়া যেমন কোটি মানুষকে শোকাহত করেছিল, তেমনি ব্যক্তিগত স্মৃতির জায়গা থেকে সাবিনার জন্যও তা ছিল বেদনার।
একজন শিল্পীর প্রকৃত সাফল্য কেবল পুরস্কারের সংখ্যায় মাপা যায় না। কখনো কখনো একজন শ্রোতার চোখের পানি, একজন কিংবদন্তির প্রশংসা কিংবা একটি স্মরণীয় আলিঙ্গন হয়ে ওঠে শিল্পীর সবচেয়ে বড় অর্জন। সাবিনা ইয়াসমীনের জীবনে শচীন দেব বর্মণের আবেগ আর লতা মঙ্গেশকরের প্রশংসার সেই মুহূর্তগুলো তেমনই অমূল্য স্মৃতি।
বাংলা গানের যে স্বর্ণালি অধ্যায় সাবিনা ইয়াসমীন তাঁর কণ্ঠ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন, তার আবেদন আজও অমলিন। তাঁর গান শুধু বিনোদন দেয়নি; বহু মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ ও দেশপ্রেমের সঙ্গে মিশে গেছে। তাই সময়ের স্রোত পেরিয়েও সাবিনা ইয়াসমীনের কণ্ঠ বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।