প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিশূর জেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তামিলনাড়ুর আট প্রকৌশল শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে জাতীয় মহাসড়ক-৬৬-এর কৈপামঙ্গলম এলাকায় একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকা লরির পেছনে সজোরে ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের তীব্রতায় গাড়িটি প্রায় সম্পূর্ণ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ কর্মীদের দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার রাত প্রায় ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ত্রিশূর জেলার কৈপামঙ্গলমের পানাম্বিক্কুন্নু এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। তামিলনাড়ু নিবন্ধিত গাড়িটি গুরুভায়ুর থেকে কোডুঙ্গাল্লুরের দিকে যাচ্ছিল। ওই সময় নির্মাণকাজ চলার কারণে জাতীয় মহাসড়কের একটি অংশে যান চলাচলের গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছিল। রাস্তার ওই অংশে ব্যারিকেডও ছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, মহাসড়কের পাশে একটি লরি দাঁড়িয়ে ছিল। স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, নির্মাণাধীন সড়কের পাশে লরিটি এমনভাবে রাখা হয়েছিল, যা রাতের বেলায় চলাচলকারী যানবাহনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গাড়িটি দ্রুতগতিতে চলছিল কি না এবং চালক শেষ মুহূর্তে রাস্তার পরিবর্তিত গতিপথ বা ব্যারিকেড দেখতে পেয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, রাস্তার ডাইভারশন এবং দাঁড়িয়ে থাকা লরির অবস্থান বুঝে ওঠার আগেই গাড়িটি সেটির পেছনে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয়। সংঘর্ষের পর গাড়ির সামনের অংশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ভেতরে থাকা যাত্রীরা গুরুতরভাবে আটকা পড়েন। দুর্ঘটনার শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলকে খবর দেন।
উদ্ধারকাজে গিয়ে ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে হয় উদ্ধারকারীদের। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির দরজা ও বিভিন্ন অংশ এমনভাবে আটকে গিয়েছিল যে সাধারণভাবে যাত্রীদের বের করা সম্ভব ছিল না। পরে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহার করে গাড়ির অংশ কেটে ভেতরে আটকে থাকা ব্যক্তিদের বের করে আনেন।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত আরও কয়েকজনকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন প্রাথমিক প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে সামান্য পার্থক্য থাকলেও মোট আটজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
নিহতদের সবাই তামিলনাড়ুর দিন্দিগুলের একটি প্রকৌশল কলেজের শিক্ষার্থী বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে সূর্য, যুবসঞ্জিত, বিশ্ব, জোহুয়া, সন্তোষ ও প্রসন্ন নামের ছয় শিক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। প্রথম চারজন দিন্দিগুলের এবং সন্তোষ ও প্রসন্ন মাদুরাইয়ের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। বাকি দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
শিক্ষার্থীরা কী উদ্দেশ্যে কেরালায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তারা দলবদ্ধভাবে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। রাতের সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাঁদের পরিবারের জন্য ভয়াবহ শোকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্ঘটনার পর নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে তাঁদের সঙ্গে থাকা পরিচয়পত্র ও অন্যান্য নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্ধার করা সামগ্রী পরীক্ষা করে পুলিশ পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। অনেক পরিবারই রাতের ওই যাত্রা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিলেন না বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সন্তানদের দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে গভীর শোক।
নিহত শিক্ষার্থীদের মরদেহ ত্রিশূর মেডিক্যাল কলেজের মর্গে নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর তাঁদের মরদেহ তামিলনাড়ুতে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করেছে কৈপামঙ্গলম পুলিশ। গাড়িটির গতি, চালকের নিয়ন্ত্রণ, সড়কের আলো, ব্যারিকেডের দৃশ্যমানতা এবং লরিটি মহাসড়কের পাশে কীভাবে দাঁড়িয়ে ছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্মাণকাজের কারণে তৈরি হওয়া ডাইভারশন এলাকায় পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের মামলায় লরি চালকের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর লরি চালক ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে গেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁকে শনাক্ত ও আটক করার চেষ্টা চলছে।
এই দুর্ঘটনা কেরালার নির্মাণাধীন মহাসড়কে সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের কাজ চলায় অনেক জায়গায় যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচলের পথ পরিবর্তন করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলো, স্পষ্ট সংকেত, দৃশ্যমান ব্যারিকেড এবং নিরাপদভাবে ভারী যানবাহন পার্ক করার বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণাধীন সড়কের অংশে দাঁড়িয়ে থাকা ভারী যানবাহন এবং পরিবর্তিত যান চলাচলের পথ অনেক সময় চালকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে কোনো যানবাহন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে সেটি দূর থেকে স্পষ্টভাবে দেখা না গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এই দুর্ঘটনায় ঠিক কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
সড়ক দুর্ঘটনায় আট তরুণ শিক্ষার্থীর মৃত্যু শুধু তাঁদের পরিবারের জন্য নয়, তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সহপাঠীদের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি। প্রকৌশল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে থাকা এই তরুণদের সামনে ছিল দীর্ঘ ভবিষ্যৎ। কিন্তু একটি রাতের সড়কযাত্রা তাঁদের জীবন থামিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের স্বপ্ন, শিক্ষাজীবনের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতের অসংখ্য পরিকল্পনাও মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু চালকের দায়িত্ব নয়। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, সড়ক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, ভারী যানবাহনের চালক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত দায়িত্ব রয়েছে। একটি নির্মাণাধীন সড়কে সামান্য অসতর্কতাও কখনো কখনো ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
কেরালার এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে। তবে আট তরুণের প্রাণহানির পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা। নির্মাণাধীন মহাসড়কে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা, রাতের দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা এবং রাস্তার পাশে ভারী যানবাহন দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম কার্যকর করা গেলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। একটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত ও দায় নির্ধারণের পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগই হতে পারে এই মর্মান্তিক ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।