আগাম হামলার পথে ইরান, বদলেছে সামরিক নীতি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪ বার
আগাম হামলার পথে ইরান, বদলেছে সামরিক নীতি

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের সামরিক নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে ইরান কোনো ধরনের হুমকি অনুভব করলে শুধু হামলার জবাব দেওয়ার অপেক্ষায় থাকবে না; প্রয়োজন মনে করলে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে আগাম অভিযান পরিচালনা করবে। সাম্প্রতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই দেশটির সামরিক কৌশলে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

৪ সেপ্টেম্বর ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারে দেওয়া বক্তব্যে আকরামিনিয়া বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানের সেনাবাহিনী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসিকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সামরিক বাহিনী এখন আগের তুলনায় বেশি প্রস্তুত, আত্মবিশ্বাসী এবং সংঘাত মোকাবিলায় সক্ষম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সামরিক কৌশলের এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া।

ইরানের সামরিক বাহিনী এতদিন মূলত প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানের ওপর জোর দিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি বক্তব্যে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেই অবস্থান ধীরে ধীরে আক্রমণাত্মক ও সক্রিয় প্রতিরোধের দিকে যাচ্ছে। আগস্টেও আকরামিনিয়া জানিয়েছিলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার ফলে ইরানের সামরিক মতবাদ প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে আক্রমণাত্মক অবস্থানের দিকে সরে গেছে। নতুন অবস্থানের মধ্যে দ্রুত পাল্টা আঘাত, বিস্তৃত পরিসরে প্রতিক্রিয়া এবং প্রয়োজন হলে আগাম অভিযান পরিচালনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ বক্তব্যে সেই অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন আকরামিনিয়া। তিনি বলেন, ইরান যখন কোনো হুমকি অনুভব করবে, তখন নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য আগাম অভিযান পরিচালনা করবে। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই এ ধরনের পদক্ষেপের বৈধতার ভিত্তি রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক কর্মকাণ্ডকে এই পরিবর্তিত নীতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আরও জানান, দেশটির সামরিক বাহিনী এখন অসম যুদ্ধকৌশল বা অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার এবং সমন্বিত কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কৌশল ব্যবহারে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং এর ফলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে দ্রুত আঘাত হানার সক্ষমতা বেড়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সক্ষমতা সমন্বিতভাবে ব্যবহারের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।

ইরানের সামরিক নীতিতে এই পরিবর্তনের পেছনে সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসের সংঘাতে দেশটি একদিকে সরাসরি হামলার মুখোমুখি হয়েছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও আঞ্চলিক অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে। এর ফলে তেহরান মনে করছে, কেবল নিজ ভূখণ্ডে হামলা প্রতিহত করার কৌশল ভবিষ্যতের পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ইরান এখন সম্ভাব্য হামলার উৎস, সামরিক ঘাঁটি ও আঞ্চলিক সহযোগী অবকাঠামোর দিকে আগেই নজর দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করছে। ইরানি কর্মকর্তাদের আগের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত শুরু হলে এর ভৌগোলিক পরিসর আরও বিস্তৃত হতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাও সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

আকরামিনিয়া সাম্প্রতিক ইরানি পাল্টা অভিযানের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানি বাহিনী বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইরানের দাবি করা এসব অভিযানের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয় রয়েছে। তবে এসব হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে ইরানের দাবির সবগুলো অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইরানের এই নতুন সামরিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, কোনো দেশ সম্ভাব্য হুমকি দেখেই আগাম সামরিক অভিযান চালানোর নীতি গ্রহণ করলে ভুল হিসাব বা গোয়েন্দা তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা থেকেও বড় ধরনের সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, ইরান এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সামরিক উপস্থিতি ও পারস্পরিক উত্তেজনার কারণে ছোট একটি সামরিক পদক্ষেপ দ্রুত বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

এরই মধ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তেহরানের সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে উদ্বেগও বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই জলপথ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

ইরানের নতুন সামরিক মতবাদ তাই শুধু দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলের পরিবর্তন নয়; এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তেহরান যদি সম্ভাব্য হুমকির জবাবে আগাম অভিযানকে নিয়মিত সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে প্রতিপক্ষ দেশগুলোও নিজেদের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে পারে। এতে আঞ্চলিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং সামরিক প্রস্তুতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে ইরানের বক্তব্যের পাশাপাশি এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ যে, ‘আগাম আত্মরক্ষা’ বা ‘প্রতিরোধমূলক অভিযান’-এর বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক রয়েছে। কোনো রাষ্ট্র নিজেকে সম্ভাব্য হামলার মুখে মনে করলেই অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সামরিক হামলা চালাতে পারে কি না, তা পরিস্থিতি, প্রয়োজনীয়তা ও আত্মরক্ষার আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে ইরানের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক আইনের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সেটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সর্বসম্মত অবস্থান হিসেবে দেখা যায় না।

ইরানের সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো, ভবিষ্যৎ সংঘাতে তেহরান আগের তুলনায় দ্রুত এবং আরও কঠোরভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত। দেশটির কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, নতুন সামরিক কৌশলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, আগাম পদক্ষেপ এবং সংঘাতের প্রয়োজনে নতুন ভৌগোলিক ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

আকরামিনিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ইরানকে শুধু ক্ষয়ক্ষতির অভিজ্ঞতাই দেয়নি, বরং সামরিক পরিকল্পনা ও কৌশল পুনর্বিবেচনার সুযোগও দিয়েছে। এখন থেকে কোনো পক্ষ ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপ নিলে তেহরান আগের মতো শুধু প্রতিক্রিয়া জানাবে না—প্রয়োজনে হুমকি মোকাবিলায় আগাম অভিযানও চালাতে পারে। এই বার্তা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত