ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে মস্কো-কিয়েভে ট্রাম্পের দূত

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩ বার
ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে মস্কো-কিয়েভে ট্রাম্পের দূত

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ বন্ধে একটি পরিকল্পনা নিয়ে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো ও ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ সফরে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। শুক্রবার ট্রাম্প নিজেই তাঁর দুই প্রতিনিধির এই সফরের কথা জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, কুশনার ও উইটকফের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের একটি প্রস্তাব রয়েছে। তাঁদের দায়িত্ব হবে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ধরনের সমঝোতার পথ খুঁজে বের করা। দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী এই সংঘাতের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র এবার সরাসরি কূটনৈতিক উদ্যোগকে আরও সক্রিয় করতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে।

ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, শান্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। সেই পরিকল্পনা নিয়ে কুশনার ও উইটকফকে রাশিয়া ও ইউক্রেনে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, দুজনই দক্ষ আলোচক এবং এর আগে তাঁরা বিভিন্ন জটিল আন্তর্জাতিক বিষয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করার কথা বলে আসছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময়ও তিনি যুদ্ধ অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে ওঠে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথ তৈরি করা।

তবে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের বিস্তারিত বিষয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষ করে ইউক্রেনের দখল হয়ে যাওয়া ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প শুক্রবার স্পষ্ট কোনো তথ্য দেননি। ইউক্রেনকে কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব পরিকল্পনায় রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বিস্তারিত না জানিয়ে শুধু শান্তির একটি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন।

এ বিষয়টিই সম্ভাব্য আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান বিরোধ হলো দখল করা অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ অবস্থান। ইউক্রেন বরাবরই নিজেদের ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার ওপর জোর দিয়ে আসছে। অন্যদিকে রাশিয়া যেসব অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, সেগুলো নিয়ে মস্কোর অবস্থানও কঠোর।

ফলে শুধু যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করতে হলে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, সামরিক উপস্থিতি, বন্দিবিনিময় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থাসহ একাধিক জটিল বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। এ কারণে কুশনার ও উইটকফের সফরকে শুধু একটি সাধারণ কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁদের আলোচনায় যুদ্ধের পরবর্তী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসতে পারে।

কুশনার ও উইটকফ এর আগেও মস্কো সফর করেছেন। তাঁদের রাশিয়া সফরের কারণে সমালোচনাও রয়েছে। ইউক্রেনপন্থী কিছু মহল অভিযোগ করেছে, দুই মার্কিন দূত আলোচনায় রাশিয়ার অবস্থানের প্রতি তুলনামূলকভাবে বেশি সহানুভূতিশীল। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তাঁদের ভূমিকা শান্তি আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সমঝোতা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।

এবারের সফরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এ কারণে যে, তাঁরা প্রথমবারের মতো ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুদ্ধবিধ্বস্ত কিয়েভে যাচ্ছেন। মস্কোর পাশাপাশি কিয়েভ সফর করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এতে আলোচনার ক্ষেত্রে কোনো একটি পক্ষের পরিবর্তে দুই পক্ষের উদ্বেগ ও শর্ত বোঝার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তিনি এর আগে মার্কিন দূতদের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, আলোচনার সময় আকাশপথে হামলা বন্ধ রাখার পাশাপাশি রাশিয়াকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে। আলোচনা যতদিন চলবে, ততদিন এই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন।

জেলেনস্কির এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ইউক্রেন সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করছে না। তবে যুদ্ধবিরতি এবং স্থায়ী শান্তিচুক্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমঝোতায় রূপ দেওয়া অনেক বেশি কঠিন। অতীতে বিভিন্ন যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

এদিকে কুশনার ও উইটকফের মস্কো সফর ঘিরে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তাঁদের বৈঠকের সম্ভাবনার কথা সামনে এসেছে। মস্কোতে আলোচনার পর তাঁরা কিয়েভে গিয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে জানা গেছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান সরাসরি বোঝার সুযোগ পাবেন মার্কিন প্রতিনিধিরা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু দুই দেশের মধ্যকার সংঘাত নয়; এর প্রভাব ইউরোপের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিনের সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলার মধ্যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।

বিশেষ করে শীতকাল ঘনিয়ে এলে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার আশঙ্কা বাড়ে। যুদ্ধের কারণে লাখো মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়েছে। অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন। কেউ হারিয়েছেন বাড়িঘর, কেউ জীবিকা, আবার কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রিয়জনকে। তাই কূটনৈতিক আলোচনার প্রতিটি উদ্যোগ সাধারণ মানুষের কাছে নতুন আশার বার্তা বহন করে।

তবে শান্তি আলোচনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য এখনো রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে মস্কো ও কিয়েভের আস্থা ধরে রেখে একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতার কাঠামো তৈরি করতে হবে। কোনো পক্ষ যদি মনে করে আলোচনার ফল তাদের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর হবে, তাহলে উদ্যোগটি ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

ট্রাম্প অবশ্য শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আশাবাদী। তাঁর প্রশাসন মনে করছে, সরাসরি আলোচনা ও চাপ প্রয়োগের সমন্বয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সংঘাতের একটি রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব হতে পারে। কুশনার ও উইটকফের মস্কো ও কিয়েভ সফর সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই অংশ।

শেষ পর্যন্ত এই সফর থেকে কী ফল পাওয়া যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আলোচনায় যুদ্ধবিরতির কোনো নতুন কাঠামো তৈরি হয় কি না, দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ আরও প্রশস্ত হয় কি না এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তির ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয় কি না—এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে আন্তর্জাতিক মহল।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশই বড় মূল্য দিয়েছে। এখন কুশনার ও উইটকফের কূটনৈতিক মিশন সেই সংঘাতের অবসানের জন্য নতুন একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শান্তির পথ যে সহজ নয়, তা স্পষ্ট। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে নয়, আলোচনার টেবিলে কতটা সমঝোতা সম্ভব হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সফলতা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত