৪১ দেশে প্রবাসীদের এনআইডি সেবা সম্প্রসারণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৬৪ বার
৪১ দেশে প্রবাসীদের এনআইডি সেবা সম্প্রসারণ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের বাইরে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি সেবা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে ৪১টি দেশে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে প্রবাসীদের পাসপোর্ট, এনআইডি এবং অন্যান্য কনস্যুলার সেবা আরও দ্রুত, সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রবাসীদের জন্য এনআইডি সেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগটি দেশের বাইরে থাকা লাখো বাংলাদেশির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের অনেককেই বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। বিশেষ করে পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধনসহ গুরুত্বপূর্ণ নথির কাজ করতে গিয়ে সময়, অর্থ ও যাতায়াতের বাড়তি চাপ তৈরি হয়। নতুন উদ্যোগের ফলে এসব সেবা আরও সহজলভ্য করার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের টেবিলে উপস্থাপিত তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি জানান, এরই মধ্যে ১৭টি দেশে অবস্থিত ২৭টি বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

বিদেশে এনআইডি সেবার ক্ষেত্রে দূতাবাস বা বাংলাদেশ মিশনগুলো আবেদন গ্রহণ করছে। তবে আবেদন যাচাই ও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রদানের মূল কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। অর্থাৎ প্রবাসীরা সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও এনআইডি ইস্যুর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের কাছেই থাকছে।

পর্যায়ক্রমে ৪১টি দেশে এই সেবা চালু হলে বিদেশে বসবাসরত আরও বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে প্রবাসীদের নাগরিক পরিচয় সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সহজ হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় ভিত্তি তৈরি হবে।

প্রবাসীদের জন্য শুধু এনআইডি নয়, পাসপোর্ট সেবাকেও আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যেসব বাংলাদেশি মিশনে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম চালু রয়েছে, সেখানে অনলাইনে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। প্রবাসীরা নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট সম্পন্ন করতে পারেন। আবেদন করার পর সেটির অগ্রগতিও অনলাইনে জানা সম্ভব হচ্ছে।

এ ব্যবস্থার ফলে প্রবাসীদের বারবার দূতাবাসে গিয়ে আবেদনের অবস্থান জানার প্রয়োজন কমছে। অনলাইনে আবেদন এবং আবেদনের অগ্রগতি দেখার সুবিধা থাকায় কর্মব্যস্ত প্রবাসীদের সময় সাশ্রয় হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা বেশি এবং দূতাবাসে সেবাপ্রার্থীর চাপ তুলনামূলক বেশি, সেখানে ডিজিটাল সেবার গুরুত্ব আরও বেশি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দূতাবাস পাসপোর্টের আবেদন গ্রহণ করলেও পাসপোর্ট ঢাকায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে ইস্যু করা হয়। দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট ডেলিভারি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মিশনগুলো নিয়মিত ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে। পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে আবেদনকারীকে এসএমএস অথবা ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।

প্রবাসীদের পাসপোর্ট সমস্যার ক্ষেত্রে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই দুই দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী ও প্রবাসী বসবাস করেন। ফলে সেখানে পাসপোর্ট সংক্রান্ত সেবার ওপর চাপও তুলনামূলক বেশি। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বল্পমেয়াদি বিশেষ কর্মসূচি বা ক্র্যাশ প্রোগ্রামের আওতায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে ঢাকা থেকে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব দলের মাধ্যমে পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কারণে পাসপোর্ট সেবা পেতে সমস্যায় থাকা প্রবাসীদের ভোগান্তি কমতে পারে।

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য কনস্যুলার সেবাকে আরও সহজ করতে অনলাইন সত্যায়ন এবং ই-অ্যাপোস্টিল ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এর ফলে সেবাপ্রার্থীরা অনলাইনে আবেদন করে ডিজিটাল সনদ গ্রহণ করতে পারছেন। আগে যেসব কাজে কাগজপত্র নিয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা মিশনে যেতে হতো, সেগুলোর একটি অংশ এখন অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবনে এসব সেবার প্রয়োজন অনেক বেশি। বিদেশে চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা কিংবা পারিবারিক নানা কাজে তাদের বিভিন্ন সরকারি নথি প্রয়োজন হয়। কোনো নথিতে ভুল থাকলে বা সত্যায়নের প্রয়োজন হলে দেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারিত হলে এ ধরনের কাজে সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনায় পাসপোর্ট, ভিসা এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সনদের তথ্য যাচাই সহজ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি অনলাইন ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন সরকারি নথির তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সমন্বিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রবাসীদের বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয়। একটি সমন্বিত অনলাইন ব্যবস্থা চালু হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান সহজ হবে এবং নথি যাচাইয়ের সময় কমে আসতে পারে। একই সঙ্গে জাল বা ভুল তথ্য শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিটি বাংলাদেশি মিশনে অনলাইন ‘গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সিস্টেম’ চালু রয়েছে বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর মাধ্যমে সেবাপ্রার্থীরা বিভিন্ন সমস্যা বা অভিযোগ জানাতে পারবেন। প্রবাসীদের সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি হলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক পথ তৈরি হয়েছে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে।

প্রবাসীদের কাছে দূতাবাস শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়; বিদেশের মাটিতে তাদের নাগরিক ও প্রশাসনিক সহায়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পাসপোর্ট, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, কাগজপত্র সত্যায়নসহ নানা প্রয়োজনে তাদের বাংলাদেশ মিশনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই এসব সেবাকে দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবনেও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য সহজলভ্য সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রবাসী দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে দূতাবাসে একাধিকবার যাতায়াত করতে পারেন না। অনলাইন আবেদন, বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের সুবিধা এবং ডিজিটালভাবে আবেদনের অগ্রগতি জানার সুযোগ থাকলে তাদের কর্মঘণ্টা ও আয় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে।

এনআইডি সেবা ৪১টি দেশে সম্প্রসারণের উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবাসীদের নাগরিক পরিচয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সংযোগ আরও শক্তিশালী করা। বিদেশে বসবাস করলেও তারা বাংলাদেশের নাগরিক। জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র সহজে পাওয়ার সুযোগ তাদের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে।

তবে নতুন সেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর মান, তথ্যের নিরাপত্তা, আবেদন যাচাই এবং সময়মতো সেবা প্রদান নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার ফলে সঠিক তথ্য সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এনআইডি সেবা ধাপে ধাপে আরও দেশে পৌঁছাবে। পাশাপাশি পাসপোর্ট, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নথি সত্যায়ন এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে প্রযুক্তির আওতায় আনার উদ্যোগ চলবে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেশের প্রশাসনিক সেবার দূরত্ব আরও কমে আসতে পারে।

প্রবাসীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেবা পেতে কতটা সময়, অর্থ ও পরিশ্রম কমছে। দীর্ঘ যাত্রা, কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়া কিংবা একাধিকবার দূতাবাসে যাওয়ার প্রয়োজন কমলে তাদের জন্য সেটিই হবে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সবচেয়ে বড় সুফল। আর সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবে কতটা দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্যভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।

৪১টি দেশে এনআইডি সেবা সম্প্রসারণ, অনলাইন পাসপোর্ট আবেদন, ই-অ্যাপোস্টিল, তথ্য যাচাইয়ের সমন্বিত ব্যবস্থা এবং অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে প্রবাসী সেবায় ডিজিটাল রূপান্তরের একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য নাগরিক সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া যেমন সহজ হবে, তেমনি দেশের সঙ্গে তাদের প্রশাসনিক ও নাগরিক যোগাযোগও আরও শক্তিশালী হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com