একনেকে উঠছে ৬৫ হাজার কোটি টাকার ১৬ প্রকল্প

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৪৪ বার
একনেকে উঠছে ৬৫ হাজার কোটি টাকার ১৬ প্রকল্প

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৬৫ হাজার ৫১৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ের ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে পরিবহন, রেল, স্বাস্থ্য, সড়ক, পানি সম্পদ, প্রতিরক্ষা, আর্থিক খাত, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষায়।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ২৫ হাজার ২৭৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ হিসেবে ধরা হয়েছে ৪০ হাজার ১৬৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৭২ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ১২টি নতুন এবং চারটি সংশোধিত প্রকল্প।

এই বিপুল বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে। প্রস্তাবিত ১৬ প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ‘ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫) সাউদার্ন রুট’। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি ১০ লাখ টাকা।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা এই প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। রাজধানীর দীর্ঘমেয়াদি গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে মেট্রোরেল লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুটকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর বাস্তবায়ন হলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সংযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

একনেকের এ সভায় রেল যোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের প্রথম সংশোধিত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। মূল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন কাঠামো ও ব্যয়ের বিষয়গুলো নতুন করে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর জন্য পৃথক একটি প্রকল্প রয়েছে। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর উদ্যোগ হিসেবে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। রেলপথে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে আরও দক্ষ ও টেকসই পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।

স্বাস্থ্য খাতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য দুটি প্রকল্প। ‘ইন্টিগ্রেটেড হেলথ সিস্টেম রেসপন্স টু ফাইট এগেইনস্ট টিবি, এইচআইভি/এইডস অ্যান্ড ম্যালেরিয়া ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৩৯ কোটি ৬ লাখ টাকা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

দেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের চাপ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

সড়ক যোগাযোগ খাতেও দুটি প্রকল্প একনেকের বিবেচনার জন্য রয়েছে। এ দুটি প্রকল্পে ব্যয় হবে যথাক্রমে ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ সহজ করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অঞ্চলগুলোর সংযোগ বাড়াতে এসব প্রকল্প ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রতিরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দুটি প্রকল্প রয়েছে। বরিশাল সেনানিবাস স্থাপনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে ব্যয় হবে ১ হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এ ছাড়া খুলনা নৌ অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৭৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আবাসিক সুবিধা তৈরির সঙ্গে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন যুক্ত থাকবে।

আর্থিক খাতেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২’-এ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর্থিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমকে আরও আধুনিক করার লক্ষ্যে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি প্রকল্পও রয়েছে প্রস্তাবিত তালিকায়। একটি প্রকল্পে ৭৫১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা এবং অন্যটিতে ৬০৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনা, পানি নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা বা নদীভাঙন মোকাবিলার মতো বিষয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় পানিসম্পদ খাতের এসব বিনিয়োগ স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ছাড়া খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আপগ্রেডেশন ও সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার মতো প্রকল্পও সংশোধিত তালিকায় রয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে নগর সেবা, বিদ্যুৎ সুবিধা এবং ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষ করে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের মাধ্যমে ভূমি জরিপ ও ব্যবস্থাপনার কাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ভূমি সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদে ভূমি প্রশাসনের বিভিন্ন জটিলতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিও এবারের প্রকল্প তালিকায় জায়গা পেয়েছে। তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়নে নেওয়া নতুন প্রকল্পে ব্যয় হবে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বাংলাদেশের রপ্তানি ও শিল্প অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক ও চামড়া খাত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এসব খাতে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

একনেকের বৈঠকে ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের আরও ১৫টি প্রকল্পের বিষয়ে সদস্যদের অবহিত করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত বড় প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি তুলনামূলক ছোট আকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগও সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সভায় আলোচিত হবে।

প্রস্তাবিত ১৬ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হওয়ায় এবারের একনেক সভা অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে মোট ব্যয়ের বড় অংশ প্রকল্প ঋণনির্ভর হওয়ায় বৈদেশিক অর্থায়ন ও ঋণের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে সংশোধনের প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। তাই অনুমোদনের পাশাপাশি বাস্তবায়নের গতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাও নজরদারির বিষয় হবে।

একনেকের সভায় কোনো প্রকল্প অনুমোদিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার ওপর প্রকল্পের নির্ধারিত সময়, ব্যয় ও লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকে। ফলে আজকের সভায় প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর অনুমোদন হলে পরবর্তী সময়ে সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি, অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং নির্ধারিত সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সব মিলিয়ে এবারের একনেক সভায় পরিবহন অবকাঠামো থেকে স্বাস্থ্য, রেল, সড়ক, পানি সম্পদ, প্রতিরক্ষা, আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং শ্রমিক কল্যাণ—বিভিন্ন খাতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে মেট্রোরেল লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকার প্রকল্পটি একাই মোট প্রস্তাবিত ব্যয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে। সভায় প্রকল্পগুলোর আর্থিক কাঠামো, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনার পর অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বর্তমানে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর ওপরই মূলত একনেকের সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ। সভায় অনুমোদনের পর সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। আর এত বড় অঙ্কের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তব সুফল জনগণের কাছে কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে পৌঁছায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com