সর্বজনীন পেনশনে আসছে নতুন সুবিধা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৭ বার
সর্বজনীন পেনশনে আসছে নতুন সুবিধা

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় ও কার্যকর করতে একাধিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার সুযোগ, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পেনশন থেকে বের হয়ে জমা অর্থ উত্তোলন, ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকে পেনশন পাওয়ার সুযোগ, স্বাস্থ্যবিমা এবং শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার মতো প্রস্তাব রয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠেয় এ বৈঠকে কর্তৃপক্ষের একাধিক আলোচ্যসূচি রয়েছে। পর্ষদের অনুমোদন পাওয়া প্রস্তাবগুলো পরবর্তী সময়ে বিধি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারে। ফলে প্রস্তাবগুলোকে এখনই কার্যকর নিয়ম হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু হয় ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট। কর্মজীবী, স্বকর্মে নিয়োজিত, অনিয়মিত আয়ের মানুষ এবং প্রবাসীদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। বর্তমানে প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস—এই চারটি স্কিমের মাধ্যমে নাগরিকদের পেনশন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত চারটি স্কিমে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজারের কাছাকাছি। সরকারি তথ্যের হিসাবে, এ সময় পর্যন্ত নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৩২৭ জন। পেনশন তহবিলের অর্থ বিভিন্ন নিরাপদ বিনিয়োগে ব্যবহারের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে প্রত্যাশিত হারে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

সর্বজনীন পেনশনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষের আগ্রহ কম থাকার পেছনে যে বিষয়গুলো আলোচনায় আসে, তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ সময় অর্থ জমা রাখার বাধ্যবাধকতা এবং জরুরি প্রয়োজনে জমা অর্থ ব্যবহারের সীমিত সুযোগ। অনেক গ্রাহকের কাছে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হঠাৎ আর্থিক সংকট দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পেনশন হিসাব থেকে কোনো অর্থই ব্যবহার করা যাবে না—এমন ধারণা সম্ভাব্য গ্রাহকদের একটি অংশকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় এবার নির্দিষ্ট শর্তে বের হওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব সামনে এসেছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি অন্তত পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে চাঁদা চালিয়ে যেতে অক্ষম হলে বিশেষ বিবেচনায় পেনশন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে জমা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ সুবিধা কী শর্তে দেওয়া হবে, কত অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে এবং কোন পরিস্থিতিকে অক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এসব বিষয় বাস্তবায়নের সময় বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

সর্বজনীন পেনশনের সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর জন্য আজীবন পেনশনের সুযোগ। বিদ্যমান ব্যবস্থায় পেনশনার আজীবন পেনশন পাওয়ার অধিকারী হলেও মৃত্যুর পর নমিনির পেনশন পাওয়ার মেয়াদ সীমিত। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পেনশনে থাকা অবস্থায় ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ মারা গেলে তাঁর নমিনি মূল পেনশনারের ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট সময়ের জন্য পেনশন পেতে পারেন।

নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে এই কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবিত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে একজন পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কমতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পেনশনের ওপর নির্ভরশীল দম্পতিদের জন্য এ ধরনের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো পেনশন পাওয়ার বয়স কমিয়ে ৫৫ বছর করা। বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার মূল কাঠামো অনুযায়ী ৬০ বছর বয়সে পেনশন পাওয়ার বিধান রয়েছে। নতুন প্রস্তাব অনুমোদিত ও কার্যকর হলে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী গ্রাহকেরা ৫৫ বছর বয়স থেকেই পেনশন পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে বয়স কমিয়ে দিলে পেনশন তহবিলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব কী হবে, চাঁদার পরিমাণ বা পেনশনের হিসাব কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এর আগে পেনশন ব্যবস্থায় এককালীন অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিয়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। পেনশন কর্তৃপক্ষের আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছানোর পর জমা অর্থের একটি অংশ এককালীন উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। নতুন প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে এ ধরনের সুবিধা যুক্ত হলে গ্রাহকের কাছে পেনশন ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করার চেষ্টা স্পষ্ট হবে।

সর্বজনীন পেনশনের আরেকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন হলো শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামি পেনশন ব্যবস্থা। অনেক নাগরিক সুদভিত্তিক আর্থিক কাঠামোর বাইরে থেকে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তাঁদের জন্য শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ও মুনাফা ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিদ্যমান ব্যবস্থার ভেতরে আলাদা ইসলামি কাঠামো বা উইন্ডো চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা যুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিকল্পনায় গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে সামান্য পরিমাণ প্রিমিয়াম নিয়ে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে। মাসিক প্রিমিয়াম তুলনামূলক কম রাখার মাধ্যমে পেনশন গ্রাহকদের জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা তৈরি করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পেনশন ব্যবস্থার পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে।

পেনশন স্কিমে গ্রাহক নিবন্ধন বাড়াতে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশনও বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে যে কমিশন দেওয়া হয়, তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংক, ডাক বিভাগ, মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ অনুমোদিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হয়। কমিশন বাড়লে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পেনশন প্রচার ও নিবন্ধন কার্যক্রমে আরও আগ্রহ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি পেনশন তহবিল পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও বিনিয়োগের মুনাফার ওঠানামাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ঝুঁকি মোকাবিলায় রিজার্ভ বা কনটিনজেন্সি তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে পেনশন দিতে হলে তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা ধরে রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির কারণে ভবিষ্যতে টাকার প্রকৃত মূল্য কমে গেলে গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তাই ঝুঁকি মোকাবিলায় আলাদা তহবিল গঠনের বিষয়টি পেনশন ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য শুধু অবসরকালীন আয় নিশ্চিত করা নয়, বরং কর্মজীবন শেষ হওয়ার পর মানুষের আর্থিক নির্ভরতা কমানো। বাংলাদেশে অনিয়মিত আয়ের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে একটি পেনশন ব্যবস্থা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে হলে শুধু ভবিষ্যৎ সুবিধার প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়; জরুরি প্রয়োজনে নমনীয়তা, পরিবারের সুরক্ষা, স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এবং বিনিয়োগের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলোর কোনটি শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পাবে এবং কোনটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে নমিনির আজীবন পেনশন, ৫৫ বছর বয়সে পেনশন এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের মতো উদ্যোগ কার্যকর হলে বিদ্যমান ব্যবস্থার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে।

বর্তমানে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা দেশের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীর তুলনায় এখনও সীমিত। ফলে মানুষের আস্থা বাড়ানো, নিয়ম সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তোলাই সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রস্তাবগুলো সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে অনুমোদনের পর বাস্তবায়নের ধরন, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে সুবিধাগুলো কতটা সহজ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় তার ওপর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com