প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর বাংলাদেশের মানবিক সহায়তা এবং জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। ২৬ আগস্টের আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর বাংলাদেশ যে সংহতি ও সহযোগিতার বার্তা দিয়েছে, তা নেপালের জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বাংলাদেশের প্রতি এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। চিঠিতে তিনি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বাংলাদেশের ১০ লাখ মার্কিন ডলারের আর্থিক সহায়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই সহায়তা নেপালের চলমান ত্রাণ, পুনরুদ্ধার ও মানবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা করেন।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, অবকাঠামো ও জীবিকার ওপর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। দুর্যোগের পর নেপালের সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার, ত্রাণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এই দুর্যোগের পরপরই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নেপালের সরকার ও জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কাছে শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি জানান। একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে নেপালকে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছিল।
এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকার নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে ১০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই অর্থ নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা। ত্রাণ, পুনরুদ্ধার এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে অর্থটি ব্যবহারের কথা জানানো হয়।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে বাংলাদেশের এই আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, নেপালের এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের এমন উদ্যোগ দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান আন্তরিক সহমর্মিতা ও সংহতির প্রতিফলন।
নেপালের জাতীয় জীবনে ভয়াবহ দুর্যোগের এমন সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তা শুধু আর্থিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠনেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া অর্থ সেই বৃহত্তর মানবিক প্রচেষ্টার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দুর্যোগের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানান। নেপালের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের সহমর্মিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৭ আগস্ট নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগ নিয়ে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সেখানে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি শোক ও সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি নেপালের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একটি রাষ্ট্রীয় দুর্যোগে অন্য দেশের জাতীয় সংসদে এ ধরনের শোক প্রকাশ দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের মানবিক দিকটিকেও সামনে নিয়ে আসে।
বালেন্দ্র শাহ তাঁর চিঠিতে নেপাল ও বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষায়, নেপাল বাংলাদেশকে শুধু ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে নয়, বরং শক্তিশালী জনগণ-থেকে-জনগণ সম্পর্কের বন্ধনে যুক্ত একজন প্রিয় বন্ধু হিসেবেও বিবেচনা করে। প্রতিকূল সময়ে বাংলাদেশের প্রদর্শিত সহমর্মিতা ও সহযোগিতা নেপালের জনগণের কাছে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। যদিও দুই দেশের মধ্যে সরাসরি স্থলসীমান্ত নেই, তবুও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উভয় দেশ পরস্পরের সঙ্গে কাজ করে আসছে। দুর্যোগের মতো মানবিক সংকটে পারস্পরিক সহযোগিতা সেই সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি করে। আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাহাড়ি নদীর পানির প্রবল স্রোত ও ভূমিধসের কারণে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। অনেক মানুষ নিখোঁজ হন এবং উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে নিরাপত্তা ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির মতো সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় উদ্ধারকারী দলগুলোকে।
এ ধরনের দুর্যোগে তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনও বড় চ্যালেঞ্জ। ঘরবাড়ি হারানো মানুষকে পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু পুনর্নির্মাণ, জীবিকা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্গত এলাকায় মৌলিক সেবা পুনঃস্থাপনে দীর্ঘ সময় ও বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয়। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে বাংলাদেশের দেওয়া সহায়তাকে এই পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশ নিজেও বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ফলে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ এবং পুনরুদ্ধারের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচিতি রয়েছে। নেপালের জন্য বাংলাদেশের সহায়তার ক্ষেত্রে সেই মানবিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলনও দেখা যায়।
বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জাতীয় সংসদের শোক প্রস্তাব এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সংহতি প্রকাশ নেপালের প্রতি একটি ধারাবাহিক মানবিক বার্তা তৈরি করেছে। বালেন্দ্র শাহের চিঠিতে এসব উদ্যোগের আলাদা করে উল্লেখ থাকায় দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দুর্যোগকালীন সহযোগিতার গুরুত্বও স্পষ্ট হয়েছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে আশা প্রকাশ করেছেন, বাংলাদেশের সহযোগিতা নেপালের জনগণকে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
দুর্যোগের ক্ষত সারিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সামনে এখনও দীর্ঘ পথ রয়েছে। ত্রাণের পাশাপাশি পুনর্গঠন ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের কাজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সংহতি নেপালের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোও সেই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগের পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া সহায়তা এবং তার জন্য নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ সেই মানবিক সম্পর্কেরই প্রতিফলন। দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতেও এমন মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান হবে কি না, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতি ও দুই দেশের পারস্পরিক উদ্যোগের ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত