প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে আজ শনিবার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে আরও সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) আওতাধীন তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে এই গ্যাস সরবরাহ করা হবে। কূপটির উৎপাদনে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর প্রচেষ্টায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের আরও কয়েকটি কূপ এবং বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের একটি গভীর কূপের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে এবং প্রত্যাশিত ফলাফল অনুযায়ী শেষ করা সম্ভব হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা ও অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তিতাস-২৮, তিতাস-২৯, তিতাস-৩০, তিতাস-৩১ এবং বাখরাবাদ-১১ নম্বর কূপ নিয়ে একাধিক কার্যক্রম একসঙ্গে এগিয়ে চলছে। এর মধ্যে তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগেই শেষ হয়েছে। কূপটির গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর কূপটি উৎপাদনে যাচ্ছে এবং উদ্বোধনের পরপরই জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করার কথা রয়েছে।
বিজিএফসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম জানিয়েছেন, তিতাস-২৮ নম্বর কূপ উদ্বোধনের পরপরই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। এ কূপ থেকে দৈনিক সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে। দেশীয় উৎস থেকে এই অতিরিক্ত গ্যাস পাওয়া গেলে আমদানিনির্ভরতার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ চলছে। প্রকল্পটির পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাস-২৮, তিতাস-২৯, তিতাস-৩০ এবং কামতা-২ নম্বর কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস-২৮ নম্বর কূপ উৎপাদনে যাওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাকি কূপগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করে গ্যাস উৎপাদনে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিতাস-২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে কূপটির লগিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ চলছে। এসব কাজ শেষ হওয়ার পর আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন। এই কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিতাস-৩০ নম্বর কূপের কাজও এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে কূপটির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সফলভাবে কাজ সম্পন্ন হলে এই কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যেতে পারে। ফলে তিতাস গ্যাসক্ষেত্র থেকেই ধাপে ধাপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
এর মধ্যে তিতাস-৩১ নম্বর কূপকে ঘিরে রয়েছে বাড়তি আগ্রহ। এটি একটি গভীর অনুসন্ধান কূপ হওয়ায় শুধু বর্তমান উৎপাদন বাড়ানো নয়, নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের সম্ভাবনাও রয়েছে। বিজিএফসিএলের গভীর অনুসন্ধান গ্যাস কূপ খনন প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল তিতাস-৩১ নম্বর কূপের খননকাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে।
তিতাস-৩১-এর লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ৬০০ মিটার। ভূগর্ভস্থ অবস্থার ওপর নির্ভর করে এ গভীরতায় প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। গভীরতার কারণে কূপটির খনন এবং পরবর্তী কার্যক্রমে তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। তবে কোনো ধরনের ভূতাত্ত্বিক জটিলতা দেখা না দিলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তিতাস-৩১ সফল হলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কূপটি অনুসন্ধানমূলক হওয়ায় এর মাধ্যমে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে নতুন মজুদের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নতুন করে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই পরিমাণ এখনো নিশ্চিত নয়।
তিতাস-৩১-এর খননকাজ শেষ হওয়ার পর ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হবে। সেই পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করেই নতুন গ্যাসের মজুদের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ফলে সম্ভাব্য দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট মজুদের বিষয়টি আপাতত প্রাথমিক হিসাব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে তিতাস-৩১-এর কাজ শেষ হওয়ার পর বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের ১১ নম্বর গভীর কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। বাখরাবাদ-১১ কূপটির লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মিটার। এটিও ভূগর্ভস্থ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে প্রায় ১০০ মিটার কমবেশি হতে পারে। সফলভাবে খনন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন হলে এই কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবগুলো কূপের সম্ভাব্য উৎপাদন হিসাব করলে জাতীয় গ্রিডে নতুন গ্যাস সরবরাহের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তিতাস-২৯, তিতাস-৩০ ও তিতাস-৩১ নম্বর কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং বাখরাবাদ-১১ থেকে প্রায় ১০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর সঙ্গে তিতাস-২৮ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট যুক্ত হলে পাঁচটি কূপ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় এই উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার উৎপাদন এবং আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি করে আসছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে গেলে সেই ঘাটতি পূরণে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। ফলে বৈশ্বিক বাজারে দাম, আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপের মতো বিষয়গুলো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতায় পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে নতুন কূপ খনন, বিদ্যমান কূপের উন্নয়ন এবং গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিতাস ও বাখরাবাদের নতুন কূপগুলো প্রত্যাশা অনুযায়ী উৎপাদনে আসতে পারলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে। এতে একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সুযোগও তৈরি হবে।
তবে সম্ভাব্য উৎপাদনের পুরোটা বাস্তবে পাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রতিটি কূপের খনন, পরীক্ষা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং গ্যাস গ্রিডে সংযুক্তির পর বাস্তব পরিস্থিতির ওপর। বিশেষ করে গভীর অনুসন্ধান কূপগুলোর ক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক অবস্থার কারণে সময় ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে।
বর্তমানে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে আনুমানিক দেড় ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। নতুন অনুসন্ধান সফল হলে এই মজুদের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ফলে আজ তিতাস-২৮ নম্বর কূপ থেকে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক সরবরাহ বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি দেশের নিজস্ব গ্যাসসম্পদকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর বৃহত্তর উদ্যোগেরও অংশ।
সব মিলিয়ে আগামী কয়েক মাস দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় হতে যাচ্ছে। তিতাস ও বাখরাবাদের কূপগুলোর কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি নতুন মজুদের সম্ভাবনাও উন্মোচিত হতে পারে। তবে প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত সাফল্য নির্ভর করবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা, কূপের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা এবং পরীক্ষার ফলাফলের ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত