ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন উদ্যোগ সরকারের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১১ বার
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন উদ্যোগ সরকারের

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ, নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং জেলেদের আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের উৎপাদন কমে আসার প্রেক্ষাপটে প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষা, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জীবিকা সচল রাখতে সরকারের বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন, বিচরণ ও বংশবৃদ্ধির পরিবেশ উন্নত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, আগের ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে এর কার্যক্রম শুরু হবে। নতুন পরিকল্পনায় আইন প্রয়োগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, জেলেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সরকারি খাদ্যসহায়তা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পে জেলেদের জন্য ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং বা ভিজিএফ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরতে না পারায় অনেক জেলে আয় থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের পরিবারেও খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে চাপ তৈরি হয়। ফলে শুধু মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিলেই ইলিশ সংরক্ষণ কার্যকর হবে না; বিকল্প জীবিকা ও পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, জেলেদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং অবৈধভাবে মাছ ধরার চাপ কমানো সম্ভব হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, ইলিশ সংরক্ষণের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে জেলেরাও এর সুফল পাবেন। চলতি বছরের ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার কথা উল্লেখ করে তিনি এই সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

ইলিশের জীবনচক্রে প্রজনন মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় প্রজননক্ষম মা ইলিশ পর্যাপ্ত নিরাপদ পরিবেশে ডিম ছাড়তে পারলে পরবর্তী প্রজন্মের মাছের সংখ্যা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা হলে ডিম উৎপাদন ও প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে ছোট আকারের জাটকা বড় হওয়ার আগেই ধরা হলে ভবিষ্যতে পূর্ণবয়স্ক ইলিশের মজুদ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে নির্ধারিত সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা মনে করেন, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয়। জাটকা নিধন, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ আহরণ, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য কমে যাওয়া, পানিদূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ সম্মিলিতভাবে ইলিশসম্পদের ওপর প্রভাব ফেলছে। তাই কেবল মৌসুমি অভিযান নয়, নদী ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টন। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বৃদ্ধির পর এই পতন ইলিশের প্রাকৃতিক মজুদ সংরক্ষণ এবং আহরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাবের মতে, ইলিশের উৎপাদন টেকসই রাখতে প্রতিবছর সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টন আহরণের বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচারে জাটকা নিধন উৎপাদন কমার গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অতীতে মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা, জাটকা আহরণে দীর্ঘমেয়াদি বিধিনিষেধ, নির্দিষ্ট অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ এবং জেলেদের সহায়তা দেওয়ার মতো উদ্যোগ উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং অভয়াশ্রমের সীমানা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও নাব্য ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া এবং অন্যান্য নদী অববাহিকার পরিবেশ ইলিশের প্রজনন ও বিচরণের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। নদীতে বর্জ্য ফেলা, দূষণ, নাব্য সংকট এবং পানির গুণগত মানের অবনতি মাছের খাদ্য ও প্রজননক্ষেত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ও মোহনার পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্প ও মাছ ধরার নৌযানের কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে রাখা এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো জরুরি।

ইলিশের খাদ্যপ্রাপ্যতাও উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় ইলিশের খাদ্য হিসেবে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদকণা ও প্রাণিকণার ভূমিকা উঠে এসেছে। গবেষণাসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মেঘনা নদীতে এসব খাদ্যকণার প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। নদীদূষণ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে খাদ্যশৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটলে ইলিশের বৃদ্ধি ও স্বাভাবিক বিচরণেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনায় শুধু মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ নয়, ইলিশের খাদ্য ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার ইলিশ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে পারে। স্যাটেলাইট ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে প্রজননক্ষেত্র ও বিচরণ এলাকা শনাক্ত করা, পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং মাছের সম্ভাব্য চলাচল সম্পর্কে পূর্বাভাস তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল তথ্যভান্ডার এবং আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষিদ্ধ সময়ে অবৈধ মাছ ধরা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তি কার্যকর করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রশিক্ষিত জনবল এবং গবেষণালব্ধ তথ্যের নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভারতের গুজরাটের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে ইলিশ উৎপাদনের পরিবর্তন নিয়েও গবেষণার আগ্রহ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই অঞ্চলের নদীর পানিপ্রবাহ, লবণাক্ততা এবং মোহনার পরিবেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে ইলিশের চলাচল ও প্রজনন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে কোনো একটি অঞ্চলে উৎপাদন বাড়ার কারণ সরাসরি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ না করে স্থানীয় পরিবেশ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যসংস্কৃতি এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাছ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, বরফ উৎপাদন, জাল ও নৌকা তৈরি এবং প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত। ফলে ইলিশের উৎপাদন কমে গেলে শুধু জেলেদের আয় নয়, এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশার মানুষের জীবনেও প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে উৎপাদন বাড়লে বাজারে সরবরাহ উন্নত হওয়ার পাশাপাশি মৎস্যনির্ভর পরিবারগুলোর আয়ের সুযোগও বাড়তে পারে।

ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবেও স্বীকৃত। দেশের জাতীয় মাছ হিসেবে এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক মূল্যও উল্লেখযোগ্য। তাই এই সম্পদ রক্ষায় স্বল্পমেয়াদি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, সরকারি প্রকল্প, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, জেলেদের সহায়তা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নদী-উপকূলের পরিবেশ সংরক্ষণকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে পারলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে শুধু প্রকল্প ঘোষণা বা অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, জেলেদের অংশগ্রহণ, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় এই সম্পদকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে সরকার, জেলে, ব্যবসায়ী, গবেষক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com