সাবেক ডিএমপি কমিশনার ও স্ত্রীর সম্পদ জব্দ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৬ বার
সাবেক ডিএমপি কমিশনার ও স্ত্রীর সম্পদ জব্দ

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক ও তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার খানের নামে থাকা সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া এ আদেশের ফলে তাঁরা আপাতত তাঁদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর, স্থানান্তর, রূপান্তর, দান কিংবা হেবা করতে পারবেন না। দুদকের আবেদনে তাঁদের নামে থাকা সম্পদের হিসাব, গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ এবং ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসংগতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আদালতের এই নির্দেশ দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও সন্দেহজনক সম্পদের ওপর আইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আদালত সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ভারপ্রাপ্ত ঢাকা মহানগর জজ ও সিনিয়র স্পেশাল জজ আয়েশা আক্তার মৌসুমী সম্পদ জব্দের আদেশ দেন। দুদকের আবেদনে খন্দকার গোলাম ফারুকের নামে এক কোটি ২৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রী শারমিন আক্তার খানের নামে তিন কোটি পাঁচ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দুই হিসাব মিলিয়ে তাঁদের নামে মোট চার কোটি ৩২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ সামনে এসেছে।

আদালতের আদেশের মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলোর ওপর সাময়িক আইনি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, যাতে তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে সেগুলো বিক্রি, অন্যের নামে হস্তান্তর কিংবা অন্য কোনোভাবে মালিকানা বা প্রকৃতি পরিবর্তনের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়াকে জটিল করা না যায়। সম্পদ জব্দের নির্দেশের অর্থ এই নয় যে অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত রায় হয়ে গেছে। বরং তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলার সময়ে সম্পদ সংরক্ষণের জন্য আদালত এ ধরনের আদেশ দিতে পারেন। অভিযোগের সত্যতা, সম্পদের প্রকৃত উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

দুদকের আবেদনে খন্দকার গোলাম ফারুকের সম্পদের যে হিসাব তুলে ধরা হয়েছে, তাতে তাঁর নামে দায় বাদ দিয়ে নিট সম্পদের মূল্য তিন কোটি ৭৬ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি তাঁর পারিবারিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। আবেদনটিতে সম্পদ ও ব্যয়ের হিসাব একত্র করে মোট পরিমাণ ছয় কোটি ১৩ লাখ টাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর বিপরীতে তাঁর গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ দুই কোটি ৮৫ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করেছে দুদক। এই হিসাবের ভিত্তিতে সংস্থাটি তাঁর নামে এক কোটি ২৭ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার অভিযোগ তুলেছে।

দুদকের এ হিসাবের তাৎপর্য হলো, একজন সরকারি কর্মকর্তার নামে থাকা সম্পদের পরিমাণ এবং তাঁর বৈধ বা গ্রহণযোগ্য আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা। সরকারি দায়িত্ব পালনকালে একজন কর্মকর্তা বেতন-ভাতা, বৈধ বিনিয়োগ, উত্তরাধিকার, উপহার বা অন্য কোনো আইনসম্মত উৎস থেকে সম্পদ অর্জন করতে পারেন। তবে এসব উৎসের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণের জন্য প্রাসঙ্গিক নথি, আয়কর বিবরণী, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলেই সেটিকে চূড়ান্তভাবে অবৈধ বলে ধরে নেওয়া যায় না; তদন্তে প্রাপ্ত প্রমাণ এবং আইনি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

খন্দকার গোলাম ফারুকের স্ত্রীর সম্পদের হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্যের অভিযোগ তুলেছে দুদক। আবেদনে বলা হয়েছে, শারমিন আক্তার খানের নামে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে মোট তিন কোটি ২৭ লাখ টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। তাঁর পারিবারিক ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে দুই লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এ দুটি হিসাব একত্র করে অর্জিত মোট সম্পদের পরিমাণ তিন কোটি ৩০ লাখ টাকা হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে তাঁর গ্রহণযোগ্য আয়ের পরিমাণ ২৪ লাখ ৭৭ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দুদকের হিসাব অনুযায়ী, এ ব্যবধানের পরিমাণ তিন কোটি পাঁচ লাখ টাকা, যা তাঁর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

স্বামী-স্ত্রীর নামে থাকা সম্পদের হিসাব পৃথকভাবে উপস্থাপন করায় তদন্তে প্রতিটি সম্পদের মালিকানা, অর্জনের সময়, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন আলাদাভাবে যাচাই করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো পরিবারের একাধিক সদস্যের নামে সম্পদ থাকলে সেগুলোর মধ্যে আর্থিক সম্পর্ক থাকতে পারে, আবার প্রত্যেকের নিজস্ব আয় বা বৈধ উৎসও থাকতে পারে। তাই সম্পদের পরিমাণের পাশাপাশি কার অর্থে সম্পদ কেনা হয়েছে, ক্রয়ের সময় কী পরিমাণ আয় ছিল এবং সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎসের পক্ষে কী ধরনের নথি রয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে আদালতের আদেশ হওয়ায় এখন সংশ্লিষ্ট সম্পদগুলোর ওপর আইনি বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। আদেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্থাবর সম্পত্তি, যেমন জমি বা বাড়ি, কিংবা অস্থাবর সম্পদ অন্যের কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। একইভাবে সম্পদের প্রকৃতি বা মালিকানা পরিবর্তন, দান কিংবা হেবা করার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। এ ধরনের নির্দেশের মাধ্যমে তদন্তাধীন সম্পদ সংরক্ষিত রাখা এবং ভবিষ্যতে আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার সুযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।

দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে সম্পদ জব্দ বা ক্রোকের মতো আইনি পদক্ষেপের গুরুত্ব রয়েছে। তদন্ত চলাকালে কোনো সম্পদ দ্রুত বিক্রি হয়ে গেলে, অন্যের নামে হস্তান্তরিত হলে বা তার প্রকৃতি পরিবর্তিত হলে ভবিষ্যতে সম্পদ শনাক্ত করা এবং আদালতের নির্দেশ কার্যকর করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে আদালত সম্পদের ওপর সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। তবে এমন পদক্ষেপকে শাস্তি হিসেবে দেখা উচিত নয়; এটি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে কার্যকর রাখার একটি আইনি ব্যবস্থা।

বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তা ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের আয়, সম্পদ এবং জীবনযাপনের ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে কি না, সে বিষয়ে নাগরিকদের প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক। সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে জনস্বার্থ ও জবাবদিহির সম্পর্ক থাকায় দুর্নীতির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনগত অধিকার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়বিচারের নীতিও সমানভাবে রক্ষা করা প্রয়োজন।

দুদকের মতো তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব হলো অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করা, সম্পদের উৎস যাচাই করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কোনো ব্যক্তির সম্পদের হিসাব ও গ্রহণযোগ্য আয়ের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেলে সেই পার্থক্যের কারণ অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষ থেকে বৈধ আয়ের কোনো উৎস, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হলে সেটিও যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। এভাবেই তদন্তের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

এ ঘটনায় আদালতের আদেশের পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা নির্ভর করবে তদন্তের অগ্রগতি, সংশ্লিষ্ট সম্পদের নথিপত্র যাচাই এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ওপর। সম্পদ জব্দের আদেশ বহাল থাকা, সংশ্লিষ্ট সম্পদের বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশ দেওয়া কিংবা তদন্তের ভিত্তিতে আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়গুলো যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে। তবে এ মুহূর্তে দুদকের আবেদনে উল্লিখিত হিসাব ও আদালতের সম্পদ জব্দের নির্দেশই মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ দিক।

খন্দকার গোলাম ফারুক ও তাঁর স্ত্রীর নামে মোট চার কোটি ৩২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ এবং আদালতের সম্পদ জব্দের আদেশ এখন তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি, সম্পদের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রয়োজন হবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও আইনসম্মত বিচারিক মূল্যায়ন। জনস্বার্থে এ ধরনের তদন্তের ক্ষেত্রে যেমন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, তেমনি প্রমাণের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির আগে কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা না করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com