কুমিল্লা জামায়াতে কমিটি নিয়ে বিরোধ, ককটেল বিস্ফোরণ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
দুর্গাপূজা ঘিরে সম্প্রীতির বার্তা জামায়াতের মতবিনিময়ে

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর নতুন কমিটি গঠন ও আমির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। কমিটি গঠন নিয়ে মতবিরোধের মধ্যে মহানগর কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ও একটি ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যা সাতটার দিকে নগরের মোগলটুলি এলাকার ফারুকিয়া হাউজিংয়ে অবস্থিত জামায়াতের মহানগর কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বৈঠক করছিলেন। বাইরে একদল নেতা-কর্মীর হট্টগোলের একপর্যায়ে বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দলীয় কমিটি গঠন নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং আসন্ন আমির নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মহানগর জামায়াতের কয়েকজন নেতার ভাষ্যে উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একই নেতৃত্ব বহাল থাকা এবং নতুন আমির নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা ভোটার তালিকা নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ জমছিল। সেই বিরোধ বুধবারের বৈঠক চলাকালে প্রকাশ্য উত্তেজনায় রূপ নেয়। তবে কারা সরাসরি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বা গাড়ি ভাঙচুর করেছেন, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। অভিযোগের বিষয়ে যাঁদের অনুসারীদের দায়ী করা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্যও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

ঘটনার সময় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুমসহ মহানগর পর্যায়ের নেতারা কার্যালয়ের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা মহানগর জামায়াতের আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতা ও রুকনদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। এমন সময় কার্যালয়ের বাইরে একদল নেতা-কর্মী জড়ো হয়ে হট্টগোল শুরু করেন। পরে কার্যালয় চত্বরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে এবং সেখানে রাখা মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানের ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। ঘটনার পর কার্যালয়ের সামনে গাড়ির ভাঙা অংশ, কাচের টুকরা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায় বলে ঘটনাস্থলের বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুল আনোয়ার জানিয়েছেন, জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ঘটনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও তদন্তের প্রক্রিয়া পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। কে বা কারা বিস্ফোরণ ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত, ঘটনার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং এতে কারও ক্ষয়ক্ষতি বা আঘাতের ঘটনা ঘটেছে কি না, এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

মহানগর জামায়াতের অন্তত তিনজন নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, দলের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধের পেছনে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং আসন্ন আমির নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁদের দাবি, বর্তমান মহানগর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ডিসেম্বরে মহানগর কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এ অবস্থায় পরবর্তী কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, বর্তমান আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ এবং দুই নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক, যিনি মামুন নামেও পরিচিত, ও মোসলেহ উদ্দিনকে পরবর্তী কমিটির নেতৃত্বে না রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত রয়েছে। তাঁদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও দলীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

নতুন আমির নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা ভোটার তালিকাও বিরোধের একটি কারণ বলে জানিয়েছেন ওই নেতারা। তাঁদের দাবি, সম্প্রতি প্রস্তুত করা তালিকায় বর্তমান আমির ও দুই নায়েবে আমিরের নাম রাখা হয়নি, যদিও মহানগর সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমানসহ অন্য নেতাদের নাম রয়েছে। এ নিয়ে দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। মাহবুবুর রহমান পরবর্তী আমির নির্বাচিত হতে পারেন—এমন ধারণা থেকে তাঁর বিরুদ্ধে জমি কেনাবেচা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগসহ নানা নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে বলেও ওই নেতারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোকে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য ও অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, রুকনদের ভোটের মাধ্যমে দলের আমির নির্বাচিত হন বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কুমিল্লা মহানগর কমিটির আমির নির্বাচনপ্রক্রিয়ার দায়িত্বে রয়েছেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাছুম। বুধবার তিনি মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা ও রুকনদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। দলীয় কয়েকজন নেতার অভিযোগ, বৈঠক চলাকালে নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হকের অনুসারীরা কার্যালয়ের বাইরে হট্টগোল শুরু করেন। এর পরপরই ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে এ কে এম এমদাদুল হকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি ওই বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছাড়া অভিযোগের দায় নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের প্রশ্নে বর্তমান আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের দীর্ঘ দায়িত্বকালও আলোচনায় এসেছে। দলীয় সূত্রের দাবি, তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে কুমিল্লা শহর জামায়াতের আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর মহানগর জামায়াতের আমিরের দায়িত্বও তিনি গ্রহণ করেন। ১৯৯৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৮ বছর ধরে শহর ও মহানগর পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্ব বহাল রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। দীর্ঘ সময় একই নেতৃত্ব দায়িত্বে থাকায় সংগঠনের অপেক্ষাকৃত নিচের সারির কিছু নেতার মধ্যে নেতৃত্বে আসার সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে তাঁদের বক্তব্য। তবে এই অসন্তোষ কতটা বিস্তৃত ছিল, দলের কতজন নেতা এর সঙ্গে একমত এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।

ঘটনার পর কেন্দ্রীয় নেতা এ টি এম মাছুম নেতা-কর্মীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধের বিষয়টি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ও নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া সাধারণত সংগঠনের সদস্যদের অংশগ্রহণ, গ্রহণযোগ্যতা এবং গঠনতান্ত্রিক নিয়মের ওপর নির্ভর করে। ভোটার তালিকা, প্রার্থীর যোগ্যতা বা নেতৃত্ব পরিবর্তন নিয়ে মতবিরোধ থাকলে তা নির্ধারিত সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা গুরুত্বপূর্ণ। মতপার্থক্য যদি সংঘর্ষ, ভাঙচুর বা বিস্ফোরণের ঘটনায় গড়ায়, তাহলে তা দলের সাংগঠনিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি জননিরাপত্তার বিষয়ও হয়ে ওঠে।

এদিকে ঘটনার পর মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, নায়েবে আমির এ কে এম এমদাদুল হক, সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান এবং সহকারী সেক্রেটারি কামারুজ্জামান সোহেলসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে গণমাধ্যমে মহানগর জামায়াতের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাঠানো হয়। কাজী দ্বীন মোহাম্মদের বরাতে পাঠানো ওই বক্তব্যে বলা হয়, কুমিল্লা মহানগরীর সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে মহানগর কার্যালয়ে পূর্বনির্ধারিত একটি সভা চলছিল। এর মধ্যে কয়েকজন যুবক সভায় ঢুকে হইচই শুরু করেন এবং চিৎকার করতে করতে চলে যাওয়ার সময় একটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। বক্তব্যে আরও বলা হয়, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

দলীয় সূত্রের বক্তব্য এবং মহানগর জামায়াতের আনুষ্ঠানিক বিবরণে ঘটনার ব্যাখ্যায় কিছু পার্থক্য থাকায় তদন্তের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একদিকে কয়েকজন নেতা কমিটি গঠন নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধকে ঘটনার পেছনের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন; অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে কয়েকজন যুবকের সভায় প্রবেশ, হইচই এবং গাড়ি ভাঙচুরের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিবরণ যাচাই করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের ভিডিও, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কারও সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের এই ঘটনা দলটির স্থানীয় সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে একটি ঘটনার ভিত্তিতে পুরো সংগঠন বা সংশ্লিষ্ট সব নেতার অবস্থান সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে মতবিরোধ কীভাবে তৈরি হয়েছে, সাংগঠনিকভাবে তা সমাধানের সুযোগ ছিল কি না এবং সংঘর্ষের ঘটনায় কারা সরাসরি জড়িত—এসব বিষয় আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণ এবং আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয়ভাবে ঘটনাটি তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে মহানগর জামায়াত। তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং কমিটি গঠন ও আমির নির্বাচন নিয়ে বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে। আপাতত কার্যালয় চত্বরে বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সাংগঠনিক মতপার্থক্যকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সমাধানের বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com