প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আসন্ন দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে কিশোরগঞ্জে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলা শাখা। বুধবার রাতে জেলা শহরের নগুয়া এলাকায় দলটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক সৌহার্দ্য এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আসন্ন দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা।
জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক রমজান আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সংগঠনটির জেলা পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যক্ষ মাওলানা আজিজুল হক, সেক্রেটারি মাওলানা নাজমুল ইসলাম এবং জেলা হিন্দু বিভাগের সেক্রেটারি কৃষ্ণ চন্দ্র বসাক। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষে বিভিন্ন মন্দির ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি মন্দিরের সভাপতি রতন কুমার দাস, হিন্দু যুব মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক কাজল দাস এবং গৌর নিতাই আখড়ার সাধারণ সম্পাদক সুনীল মুদক। এ ছাড়া মৃদুল কান্তি চৌধুরী, নারায়ণ চন্দ্র সরকার, বিশু কুমার গুপ্ত, রিপন চন্দ্র সূত্রধর ও পলাশ চন্দ্র দাসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সভাটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্গাপূজাকে ঘিরে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সামাজিক শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা করা। দুর্গাপূজা বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। পূজার সময় মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে মিলন, আনন্দ এবং পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি হয়। অনেক এলাকায় পূজামণ্ডপ স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত উদ্যোগে সাজানো হয় এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উৎসবের আয়োজন দেখতে সেখানে যান। ফলে দুর্গাপূজার শান্তিপূর্ণ আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিষয় নয়; এটি স্থানীয় সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সৌহার্দ্যের সঙ্গেও যুক্ত।
কিশোরগঞ্জের মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। ধর্মীয় পরিচয়, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে পার্থক্য থাকলেও নাগরিক হিসেবে সবার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শান্তিপূর্ণভাবে ধর্ম পালনের অধিকার সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক সম্প্রীতি গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা এবং একে অপরের অনুভূতির প্রতি সংবেদনশীল থাকার মধ্য দিয়ে। এ ধরনের মতবিনিময় সভা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সরাসরি কথা বলার সুযোগ তৈরি করে এবং উৎসব ঘিরে সম্ভাব্য উদ্বেগ বা প্রত্যাশা নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা সাধারণত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সামাজিক উৎসব হিসেবেও পরিচিত। পূজার কয়েক দিন ধরে মণ্ডপে মানুষের সমাগম বাড়ে, সাংস্কৃতিক আয়োজন হয় এবং স্থানীয় বাজার ও জনজীবনেও উৎসবের প্রভাব পড়ে। পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে যাওয়া, পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করা এবং আনন্দ ভাগাভাগি করা উৎসবের অন্যতম সামাজিক দিক। এই আনন্দ যেন কোনো ধরনের ভয়, উত্তেজনা বা বিভেদের কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।
ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে সম্প্রীতি বজায় রাখতে শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়; বাস্তব ক্ষেত্রেও সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। মন্দির ও পূজামণ্ডপের আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা, সামাজিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ থাকলে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করা সহজ হয়। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, গুজবের পরিবর্তে যাচাই করা তথ্যের ওপর নির্ভর করা এবং উত্তেজনামূলক বক্তব্য এড়িয়ে চলা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে। কিশোরগঞ্জের সভায় ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার যে বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে, সেগুলো বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে কার্যকর করাই এমন আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা নিজেদের অনুসারীদের মধ্যে সহনশীলতা, শ্রদ্ধাবোধ এবং দায়িত্বশীল আচরণের বার্তা পৌঁছে দিতে পারেন। একই সঙ্গে ভিন্ন ধর্মের মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে ভুল বোঝাবুঝি কমানো এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলা সহজ হয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কারও প্রতি অবজ্ঞা, বৈষম্য কিংবা উসকানিমূলক আচরণ যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সামাজিকভাবে সচেতন থাকা প্রয়োজন। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে।
কিশোরগঞ্জে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি স্থানীয় পর্যায়ে আন্তসম্প্রদায়িক যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে। মন্দির পরিচালনা কমিটি, যুব সংগঠন এবং অন্যান্য সামাজিক সংগঠন নিজ নিজ এলাকায় মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত উৎসবের আয়োজন, জনসমাগম ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনার সুযোগ থাকলে স্থানীয় সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ খুঁজে বের করাও সহজ হয়।
তবে একটি মতবিনিময় সভার মাধ্যমে সব ধরনের সমস্যা সমাধান হয়ে যায় না। সম্প্রীতি বজায় রাখতে প্রয়োজন ধারাবাহিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য। দুর্গাপূজার সময় কোনো এলাকায় নিরাপত্তা, যানবাহন চলাচল, জনসমাগম কিংবা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আয়োজকদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা উৎসবকে সুশৃঙ্খল রাখতে সহায়ক হয়। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হলে ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের অধিকার ও অনুভূতির প্রতি সম্মান বজায় রাখা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় বৈচিত্র্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একই সমাজে বসবাস, কাজ ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং স্থানীয় পর্যায়ের সংলাপ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্মীয় পরিচয়কে বিভেদের কারণ না করে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সহনশীলতা, মানবিকতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরির ক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব রয়েছে।
কিশোরগঞ্জের সভায় অংশগ্রহণকারীরা ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। এ প্রত্যাশা বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখা, মন্দির ও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার বিষয়ে দায়িত্বশীল থাকা এবং যেকোনো সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোনো ধরনের গুজব বা উসকানিমূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়লে তা যাচাই করা এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে—এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জে জামায়াতে ইসলামী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিনিধিদের এই মতবিনিময় সভা ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সামাজিক সহযোগিতার গুরুত্ব সামনে এনেছে। সভায় অংশ নেওয়া নেতৃবৃন্দ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্যাপনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। এখন এই প্রত্যাশাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দিতে স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও সবার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উৎসব পালনের অধিকার নিশ্চিত করা গেলে কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রীতির পরিবেশ আরও সুদৃঢ় হতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত