প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসন, স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির কারণে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন এবং দেশের উন্নয়নকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ জন্য সবাইকে ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে কৃষি খাতকে লাভজনক করা, কৃষকের হাতে সরাসরি সরকারি প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়া এবং গবেষণার মাধ্যমে কৃষির মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর দুপুরে গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সভায় দেশের সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতি, কৃষির অর্থনৈতিক সংকট, কৃষিবিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো নিয়ে তাঁর বক্তব্য গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়, ন্যায্য আয় এবং কৃষিপণ্যের বাজারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং তা থেকে উত্তরণের সম্ভাবনা—দুটি বিষয়ই উঠে এসেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ধৈর্য ধরে সামনে এগোতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুযোগকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর পদক্ষেপ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে নাগরিক সেবা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও জবাবদিহির ঘাটতি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এই প্রেক্ষাপটে প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন ও দায়িত্বশীলতার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে তাঁর উত্থাপিত সমস্যাগুলো সমাধানে কোন কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
কৃষি খাতের সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বিশেষভাবে কৃষকের আয় ও পেশার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, কৃষি এখন লাভজনক না হওয়ায় অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে ন্যায্য দামে বিক্রি না হলে কিংবা উৎপাদন খরচের তুলনায় আয় কম হলে কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব শুধু কৃষকের পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সরবরাহ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কৃষকের হাতে সরাসরি সরকারি প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সহায়তা যেন প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়া গেলে বীজ, সার, সেচ, শ্রমিকের মজুরি এবং অন্যান্য উৎপাদন ব্যয়ের চাপ মোকাবিলায় তাঁরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে প্রণোদনা কার্যকর করতে সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন, স্বচ্ছ বিতরণব্যবস্থা এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকেরা সহায়তা পাচ্ছেন কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট নয়; উৎপাদনব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানও প্রয়োজন। এ কারণে গবেষণার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি মনে করেন, কৃষির বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর সমাধান গবেষণার মাধ্যমেই বের করে আনতে হবে। মাটির উর্বরতা, জলবায়ুর পরিবর্তন, পানির প্রাপ্যতা, রোগবালাই, উৎপাদন খরচ এবং ফসলের ফলন—এসব ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ কৃষিকে আরও টেকসই করতে পারে। গবেষণালব্ধ জ্ঞান মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা গেলে কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি কমানোও সম্ভব হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে উপযোগী প্রযুক্তি, উন্নত জাত এবং কার্যকর উৎপাদনপদ্ধতি উদ্ভাবন করা কৃষি গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য। তবে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কৃষকের কাছে পৌঁছানো এবং তা ব্যবহার করার সক্ষমতা তৈরি করাও সমান প্রয়োজনীয়। গবেষক, কৃষি সম্প্রসারণকর্মী, কৃষক এবং বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে উদ্ভাবনের সুফল আরও বিস্তৃতভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
কৃষিবিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টিও রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে আইন সংশোধন করে হলেও কৃষিবিজ্ঞানীদের পেনশনের সুব্যবস্থা করতে হবে। গবেষণায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল ধরে রাখা, তরুণ বিজ্ঞানীদের এ পেশায় আগ্রহী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় উৎসাহ জোগানোর জন্য পেশাগত নিরাপত্তা ও উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার ফল অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না; একটি নতুন জাত উদ্ভাবন কিংবা উৎপাদনপ্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে দীর্ঘ সময় ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। তাই বিজ্ঞানীদের জন্য স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করা কৃষির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষিপণ্যের সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি শাকসবজি ও ফলমূল দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। বাংলাদেশে মৌসুমভিত্তিক অনেক ফল ও সবজি উৎপাদিত হলেও যথাযথ সংরক্ষণ এবং পরিবহনের অভাবে কিছু পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। দ্রুত পচনশীল এসব পণ্য সময়মতো বাজারজাত করা না গেলে কৃষক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে ভোক্তাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে হতে পারে।
আধুনিক হিমাগার, মানসম্মত প্যাকেজিং, শীতল পরিবহন এবং কার্যকর বাজারসংযোগ গড়ে তোলা গেলে এই সমস্যার কিছুটা সমাধান সম্ভব। সংরক্ষণের সুবিধা বাড়লে কৃষককে বাধ্য হয়ে ফসল বিক্রি করতে হবে না; বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিক্রির সময় নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিচালন ব্যয়, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষুদ্র কৃষকের ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে সরকারি নীতিগত সহায়তা ও যথাযথ তদারকি যুক্ত হলে সংরক্ষণব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।
কৃষিকে লাভজনক করা, গবেষণার পরিধি বাড়ানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করার বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষক উৎপাদন বাড়ালেও যদি ন্যায্য দাম না পান, তবে সেই উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল তাঁর জীবনে প্রতিফলিত হবে না। একইভাবে গবেষণায় নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হলেও তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো না গেলে কৃষির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই কৃষকের আয়, গবেষণার মান, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাজারব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠনের প্রসঙ্গের পাশাপাশি কৃষি খাতের উন্নয়নে বাস্তবমুখী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। এখন এসব বক্তব্য বাস্তবায়নে কী ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হয়, কৃষকের হাতে প্রণোদনা পৌঁছাতে কী ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং কৃষিবিজ্ঞানীদের সুযোগ-সুবিধা ও হিমাগার নির্মাণে কী অগ্রগতি হয়, সেদিকে নজর থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের। ধৈর্য, স্বচ্ছতা, গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলে কৃষি খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলো মোকাবিলা এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত