জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বাড়ছে নতুন সংশয়

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে বাড়ছে নতুন সংশয়

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে। সনদে স্বাক্ষরের এক বছর পূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বরং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোর কয়েকটি বাতিল হওয়ায় সনদের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি রূপরেখা হিসেবে জুলাই জাতীয় সনদকে সামনে আনা হয়েছিল। সনদ প্রণয়নের সময় এর সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক পক্ষগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এটি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর একটি সমঝোতাপত্র নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার একটি ভবিষ্যৎ পথরেখা। কিন্তু সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পর এর কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, নির্বাহী বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদের উচ্চকক্ষ, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতি এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য। এসব প্রস্তাবের অনেকগুলোই এখনও কার্যকর হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ।

জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের আগে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় নয় মাস বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করে। মোট ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সনদ প্রণয়ন করা হয়। গত বছরের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সনদে স্বাক্ষর করলেও কয়েকটি দল তখন এতে সই করেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তরুণদের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিও তখন সনদে স্বাক্ষর করেনি। পরে চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি দলটি এতে স্বাক্ষর করে।

সনদে স্বাক্ষরের সময় বিএনপির পক্ষ থেকে এটিকে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে উল্লেখ করে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগেই সনদ বাস্তবায়নের দাবি তুলেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর এই ভিন্ন অবস্থান পরবর্তী সময়ে সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্যে রূপ নেয়।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট। জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৮টি বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতাসহ অনুমোদন দেয় জনগণ। অর্থাৎ সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরাসরি জনগণের ভোটে অনুমোদিত হওয়ার পর এর সাংবিধানিক বাস্তবায়নের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু কয়েক মাস পার হয়ে গেলেও অনুমোদিত সংস্কারগুলোর অনেকগুলো কার্যকর না হওয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষকে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা দেওয়া, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির উদ্যোগ। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য যে সাংবিধানিক কাঠামো প্রয়োজন, তা এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। বিএনপির অবস্থান হলো, যেসব প্রস্তাবে দলটির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি, জনগণ গণভোটে যেভাবে প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করেছে, সেভাবেই সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের বক্তব্য, গণভোটে অনুমোদিত বিষয়কে রাজনৈতিক দলের পরবর্তী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পরিবর্তন করা উচিত নয়।

এই মতবিরোধের কারণে সরকার গঠিত সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির কার্যক্রম নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ কয়েকটি দল কমিটিতে অংশ নেয়নি। তাদের অভিযোগ, বিশেষ কমিটির মাধ্যমে গণভোটে অনুমোদিত সংস্কারের মূল কাঠামো পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে তাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই এবং বিরোধী দল অংশ না নিলেও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের বক্তব্যও এ বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ সংলাপের ভিত্তিতে যে সনদ তৈরি হয়েছিল, সেটি স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি জনগণের সঙ্গেও একটি ধরনের চুক্তি। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ এতে সম্মতি দেওয়ায় এখন সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি মনে করেন, সংলাপের মাধ্যমে যেসব সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর কিছু পরবর্তী সময়ে বাতিল হওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া কয়েকটি উদ্যোগও এখন আলোচনায় এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল এবং পুলিশ কমিশন নিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এসব বিষয়ে ঐকমত্যের কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় সেই কাঠামো বিলুপ্ত হয়েছে। পুলিশ কমিশনও কার্যকর কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠেনি।

বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার যে কাউন্সিল গঠন করেছিল, তার মাধ্যমে ২০২৫ সালে বিচারপতি নিয়োগও হয়েছিল। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই কাঠামোকে আরও শক্তিশালী কমিশনে রূপান্তরের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আগের ব্যবস্থাই ফিরে এসেছে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা কমানো এবং বিচার বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য তৈরির যে লক্ষ্য ছিল, সেটি কতটা এগিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সনদ প্রণয়নের সময় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কমিয়ে নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী যেন এককভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে জন্য বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ তৈরির কথা বলা হয়েছিল।

এ ছাড়া একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন—এমন প্রস্তাবও সনদে ছিল। এই বিধান কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে। বিএনপি এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে। তবে অন্যান্য ক্ষমতার ভারসাম্যসংক্রান্ত প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকায় পুরো সংস্কার প্যাকেজ শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতেও সনদে পরিবর্তনের কথা ছিল। নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রকাশ্য ব্যালট ব্যবহারের বিষয়টি সেই সংস্কারের সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে বলে সমালোচনা উঠেছে।

সনদে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়েও কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা বলা হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন রাখা। কিন্তু এসব পরিবর্তন এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কটি আরও স্পর্শকাতর। জুলাই সনদে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে অথবা অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ৯০ দিনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই সরকারকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়।

প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের জন্য প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধী দল মনোনীত ডেপুটি স্পিকার এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের প্রতিনিধিকে নিয়ে একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রস্তাব ছিল। তবে এই প্রক্রিয়ার একটি ধাপ নিয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, সংসদে কোনো দলের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার মূল কাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, বিএনপির আপত্তি থাকা সত্ত্বেও জনগণ গণভোটে জুলাই সনদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তাই জনগণের অনুমোদিত কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগকে তারা গ্রহণযোগ্য মনে করছে না।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও সরকারের বর্তমান অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন, গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদনের পর জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আর কোনো রাজনৈতিক বাধা থাকা উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, ক্ষমতার কাঠামোতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না এনে আগের ব্যবস্থার অনেকটাই বহাল রাখা হচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং সরকারি কর্ম কমিশনের নিয়োগেও পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা কমিয়ে কমিটির মাধ্যমে এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ধারণা সামনে আনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনা ও সাহসী উদ্যোগের ঘাটতি এবং আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপসের কারণে রাষ্ট্র সংস্কারের শক্ত ভিত্তি গড়ে ওঠেনি।

সব মিলিয়ে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এখন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রশ্ন নয়; এটি পরিণত হয়েছে জনগণের ভোটে অনুমোদিত রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে বড় রাজনৈতিক বিতর্কে। একদিকে সরকার বলছে, সনদ বাস্তবায়নে তাদের আন্তরিকতার অভাব নেই। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বলছে, জনগণের অনুমোদিত সংস্কারকে রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী পরিবর্তন করার সুযোগ নেই।

সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি কি বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ নেবে, নাকি রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতার হিসাবের মধ্যে আটকে থাকবে? জনগণের ভোটে অনুমোদিত সংস্কার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হবে, ততই এই প্রশ্নের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়বে।

রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, সাধারণ মানুষেরও। একটি জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ—এসব প্রত্যাশা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। জুলাই সনদ সেই প্রত্যাশাগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখায় আনার চেষ্টা করেছিল। এখন সেই রূপরেখা কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সনদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

যেসব সংস্কার ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছিল সেগুলো বাতিল হওয়া এবং গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোর বড় অংশ এখনও বাস্তবায়িত না হওয়ায় সংশয় তৈরি হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো সামনে। সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটির কাজ, সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন এবং পরবর্তী আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য দূর করে জনগণের দেওয়া সম্মতিকে কীভাবে বাস্তব রূপ দেওয়া যায়—এটাই এখন রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com