মিষ্টির আসনে বিএনপির মনোনয়ন চান ৭০ নেত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
মিষ্টির আসনে বিএনপির মনোনয়ন চান ৭০ নেত্রী

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া আসনটি ঘিরে বিএনপির নারী নেত্রীদের মধ্যে মনোনয়ন প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে। সাবেক সংসদ সদস্য, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেত্রী থেকে শুরু করে জেলা ও মহানগর পর্যায়ের সংগঠক—সব মিলিয়ে ৭০ জন নারী নেত্রী এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেতে ফরম সংগ্রহ করেছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ এবং সাংগঠনিক অবদানের স্বীকৃতি পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে তাঁরা এবার সংসদে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছেন। তবে একটি আসনের বিপরীতে এতসংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকায় শেষ পর্যন্ত দল কাকে বেছে নেয়, তা নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ১৬ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন আগ্রহী নেত্রীরা। দলের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ওই দিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ফরম বিতরণ করা হয়। ফরম পূরণ করে শনিবার একই কার্যালয়ে জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র দাখিলের পৃথক ধাপও অনুসরণ করতে হবে। ফলে দলীয় ফরম সংগ্রহ করাই চূড়ান্ত প্রার্থী হওয়ার নিশ্চয়তা নয়; বরং এটি মনোনয়ন পাওয়ার প্রতিযোগিতার প্রাথমিক ধাপ।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে এমন অনেক নেত্রী রয়েছেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেন্দ্রীয় কমিটিতে দায়িত্ব পালন করছেন, কেউ মহিলা দল বা স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে কাজ করেছেন, আবার কেউ জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁদের অনেকের দাবি, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে মামলা, হয়রানি ও নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এখন সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেলে তাঁরা নিজ নিজ এলাকার সমস্যা তুলে ধরতে এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করতে চান।

দলীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মনোনয়ন পাওয়ার আলোচনায় আগে যেসব নেত্রীর নাম উঠে এসেছিল, তাঁদের অনেকেই এবার ফরম সংগ্রহ করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সহমানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহানা আক্তার সানু ও আয়শা সিদ্দিকা মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন। তাঁদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক পরিচিতি এবং দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা মনোনয়ন আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক শাহিনুর বেগম এবং মহিলা দলের কেন্দ্রীয় মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা আতিকা ফরম সংগ্রহ করেছেন। পাশাপাশি বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদা আফরোজ হক, ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সভাপতি রুনা লায়লা এবং দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরাও এ আসনে মনোনয়ন চাইছেন।

প্রবীণ নারী নেত্রী জেলী চৌধুরীও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেরা আলাউদ্দিন হেনা ও সিমকী ইমাম খানও এবার মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সাবেক প্রচার সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদা আক্তার, আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় থাকা সৈয়দা আদিবা হোসেন এবং ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রেহানা আক্তার শিরিনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেত্রীরা এ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের অনেকের জন্য এটি নতুন করে রাজনৈতিক মূল্যায়ন পাওয়ার সুযোগ। এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চেয়েও কেউ কেউ তা পাননি। আবার কয়েকজন সরাসরি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এবার মিষ্টির পদত্যাগে আসনটি শূন্য হওয়ায় তাঁদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেত্রীদের পাশাপাশি মহিলা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সংগঠকেরাও সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। ফলে এ প্রতিযোগিতা শুধু ব্যক্তিগত মনোনয়নের লড়াই নয়; দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নারী নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সভাপতি রুনা লায়লা তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ২২টি মামলা হয়েছিল। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর তাঁর মাথায় গুলি লাগে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। ঢাকা উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় সাংগঠনিক কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রুনা লায়লা মনে করেন, দলের প্রয়োজনে তাঁকে বেছে নেওয়া হতে পারে এবং এবার তিনি রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতি পাবেন। তবে তাঁর এই প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।

দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরাও সংসদে যাওয়ার মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চান। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর এলাকার অনেক মানুষ পিছিয়ে রয়েছেন এবং তাঁদের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর মতে, সংসদে সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলে এলাকার সমস্যা তুলে ধরা এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগের পক্ষে কাজ করা সহজ হতে পারে। দল তাঁকে মূল্যায়ন করবে বলে আশাবাদী এই নেত্রী। তাঁর বক্তব্যে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের একটি সাধারণ আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে—দলীয় রাজনীতিতে অবদানের স্বীকৃতির পাশাপাশি জনসেবার সুযোগ পাওয়া।

তবে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত প্রত্যাশা যতই থাকুক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিএনপির নেতৃত্বকে। একটি আসনের বিপরীতে ৭০ জনের মনোনয়ন চাওয়া স্বাভাবিকভাবেই দলের জন্য বাছাইপ্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবদান, আন্দোলনে ভূমিকা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সংসদে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার মতো বিষয় বিবেচনায় আসতে পারে। তবে দল কোন মানদণ্ডকে কতটা গুরুত্ব দেবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কাউকে এগিয়ে রাখা সমীচীন নয়।

ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পেছনে একটি বিতর্কিত ঘটনার প্রেক্ষাপট রয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর তিনি ১ অক্টোবর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের দিনই সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা করা হয়। তবে অভিযোগের বিষয়গুলোকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর পদত্যাগের পর শূন্য আসনে উপনির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হয় এবং বিএনপির নারী নেত্রীদের মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগিতা সামনে আসে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, এ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা আগামী ১২ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৬ অক্টোবর, মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২৭ অক্টোবর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১ নভেম্বর। এসব ধাপের মধ্য দিয়ে দলীয় মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। দলীয় ফরম জমা দেওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আসনটি বিএনপির জন্য বরাদ্দ থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই নির্বাচনে অংশ নেবেন। একক প্রার্থী থাকলে এবং আইনগত সব শর্ত পূরণ হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে এখানে মূল প্রতিযোগিতা এখন বিএনপির অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন ঘিরেই। ৭০ জন নেত্রীর মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দলের নারী নেতৃত্বের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হবে। কারণ, দলীয় মনোনয়ন কেবল সংসদে প্রবেশের সুযোগ নয়; এটি দলের সাংগঠনিক মূল্যায়ন, নেতৃত্বের বিকাশ এবং নারী রাজনীতিকদের ভবিষ্যৎ ভূমিকার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসন নারীদের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তবে এই প্রতিনিধিত্ব কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে মনোনীত সদস্যের সংসদীয় সক্রিয়তা, জনসম্পৃক্ততা এবং জনগণের সমস্যা তুলে ধরার সক্ষমতার ওপর। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের কেউ যদি সংসদে যাওয়ার সুযোগ পান, তাহলে তাঁর সামনে দলীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নারী, শিশু, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এবং নিজ এলাকার উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায়বদ্ধতাও তৈরি হবে।

সব মিলিয়ে, মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া সংরক্ষিত নারী আসনটি ঘিরে বিএনপির ৭০ নেত্রীর মনোনয়নপ্রত্যাশা দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিজ্ঞ সাবেক সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের সংগঠক—বিভিন্ন পরিচয়ের নেত্রীরা নিজেদের রাজনৈতিক অবদান ও জনসেবার পরিকল্পনা সামনে আনছেন। এখন নজর বিএনপির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। কে মনোনয়ন পাবেন, কী বিবেচনায় তাঁকে বেছে নেওয়া হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কী পরিস্থিতি তৈরি হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে আগামী দিনগুলোতে। তবে এই প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নারী নেতৃত্বের মূল্যায়ন ও সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্বের প্রত্যাশা যে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com