ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব: সেতুমন্ত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব: সেতুমন্ত্রী

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় অধিকার কারও দয়া, করুণা কিংবা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সব মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্র মাঠে ধানমন্ডি সর্বজনীন পূজা উদ্‌যাপন কমিটির আয়োজনে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় শুভেচ্ছা জানান এবং প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তারা বাংলাদেশি। ধর্ম, বর্ণ কিংবা গোত্রের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়, বরং বাস্তব জীবনেও সেই অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা। একজন নাগরিক যেন নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী উপাসনা করতে পারেন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

শারদীয় দুর্গাপূজা বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মণ্ডপে মণ্ডপে পূজা, আরাধনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়। শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরাই নন, বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও অনেক স্থানে পরস্পরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। ফলে দুর্গাপূজা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি, সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের উৎসব নির্বিঘ্নে আয়োজনের জন্য নাগরিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনুষ্ঠানে ধর্মীয় অনুভূতির রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও বক্তব্য দেন শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, ধর্ম মানুষের আধ্যাত্মিক চর্চা এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম। ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দল নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে, তা কাম্য নয়। ধর্মচর্চার পরিবেশ হতে হবে স্বাধীন, নিরাপদ এবং সবার জন্য উন্মুক্ত।

ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি কেবল বক্তব্য বা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না—এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। উপাসনালয়ে যাতায়াত, ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন, উৎসব উদ্‌যাপন এবং নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কোনো নাগরিক যেন বৈষম্য বা অযৌক্তিক বাধার মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্যে নাগরিক পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখার যে আহ্বান এসেছে, তা বহুধর্মীয় সমাজে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকেই সামনে নিয়ে আসে।

দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি সম্পর্কেও অনুষ্ঠানে বিস্তারিত তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি জানান, আন্তঃমন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বৃদ্ধি করা হয়েছে। উৎসবের সময় মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখা, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

উৎসবের সময় রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষের চলাচল বেড়ে যায়। অনেকে পরিবার নিয়ে পূজামণ্ডপে যান, আবার অনেকে কর্মস্থল বা রাজধানী থেকে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে স্বজনদের সঙ্গে উৎসব উদ্‌যাপন করেন। এ কারণে সড়কে যানবাহনের চাপ, গণপরিবহনে যাত্রীদের ভোগান্তি এবং যাতায়াতের নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। মন্ত্রী বলেন, ঢাকা থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রা এবং উৎসব শেষে ঢাকায় ফেরার সময় যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে উৎসবের প্রস্তুতি কার্যকর করতে শুধু পরিকল্পনা গ্রহণই যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমও প্রয়োজন। সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, জরুরি সেবা সচল রাখা এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা উৎসবের সামগ্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে। এ কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান মন্ত্রী।

দুর্গাপূজা উদ্‌যাপনে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, প্রত্যেক ধর্মের মানুষ যেন স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা আয়োজকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পূজামণ্ডপ স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই, সেখানে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে প্রতিবছরই নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়।

অনুষ্ঠানে নিজ নির্বাচনি এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশেও বক্তব্য দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার সব নাগরিকের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা তাঁর দায়িত্ব। জনগণের ভোট ও আস্থা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ আমানত। কোনো নাগরিকের যৌক্তিক সমস্যা কিংবা অধিকারসংক্রান্ত বিষয় তাঁর নজরে এলে তা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এ সময় এলাকায় একটি স্থায়ী পূজামণ্ডপ নির্মাণের জন্য সরকারি জমি বরাদ্দের দাবি উত্থাপিত হয়। এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে উপযুক্ত সরকারি জমি রয়েছে কি না, তা চিহ্নিত করে প্রস্তাবটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। প্রস্তাবিত স্থানে সরকারের অন্য কোনো পরিকল্পনা না থাকলে ছোট পরিসরে হলেও স্থায়ী পূজামণ্ডপ নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্থায়ী পূজামণ্ডপের দাবি স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিবছর দুর্গাপূজা সামনে রেখে অস্থায়ীভাবে মণ্ডপ স্থাপন করতে গেলে জায়গা নির্ধারণ, অবকাঠামো তৈরি, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে আয়োজকদের সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। স্থায়ী আয়োজনের উপযোগী জায়গা থাকলে এ ধরনের প্রস্তুতির চাপ কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর অস্থায়ীভাবে পূজামণ্ডপ স্থাপন করতে গিয়ে আয়োজকদের যে ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়, তার একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন। ধর্মীয় চর্চার সুবিধার্থে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তবে জমি বরাদ্দের আগে উপযুক্ত সরকারি জমি শনাক্ত করা, সংশ্লিষ্ট স্থানে অন্য কোনো সরকারি পরিকল্পনা রয়েছে কি না তা যাচাই করা এবং প্রস্তাবটির বাস্তবসম্মত দিকগুলো পর্যালোচনা করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক আচরণ ও নাগরিক সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন ধর্মের মানুষের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান দেখানো, ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকা এবং কোনো সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বা মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সচেতন থাকা সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। একই সঙ্গে অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিকদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করাও প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের শেষপর্বে শেখ রবিউল আলম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশের বহুধর্মীয় সমাজে উৎসবের আনন্দ যেন প্রত্যেক নাগরিকের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়, সে জন্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসব সেই দায়িত্ব পালনের বাস্তব পরীক্ষাও বটে। ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়; বরং মানুষের নিরাপদে উপাসনা করা, উৎসব পালন করা এবং বৈষম্যহীনভাবে জীবনযাপনের সুযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। মন্ত্রীর বক্তব্যে সেই অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থায়ী পূজামণ্ডপের দাবির বিষয়টি বিবেচনার যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার ধর্মীয় উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের কিছু সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com