ক্ষমতার পালাবদল, বদলায়নি অনিয়মের চিত্র: শফিকুর রহমান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৯ বার
ক্ষমতার পালাবদল, বদলায়নি অনিয়মের চিত্র: শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বিচার ও শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দলীয়করণের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পথ অনুসরণ করছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর আশঙ্কা, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে বর্তমান সরকারকেও শেখ হাসিনার সরকারের মতো পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘মনে হচ্ছে, এক লুটেরার হাত থেকে অন্য লুটেরার হাতে ক্ষমতা গেছে।’

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে গাজীপুর মহানগর জামায়াতের উদ্যোগে টঙ্গীর শহীদ আবদুল মালেক মিলনায়তনে আয়োজিত ২০২৬ সালের রুকন সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে দলীয় সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে শফিকুর রহমান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিচার ও শিক্ষা বিভাগের কার্যক্রম, দুর্নীতি, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় নেতাকর্মীদের পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

জামায়াত আমিরের বক্তব্যের মূল সুর ছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁর অভিযোগ, সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চর্চায় পুরোনো সমস্যাগুলোর পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতি, অনিয়ম এবং দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না বলেও মনে করেন তিনি। তবে তাঁর বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়গুলোকে তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

শফিকুর রহমান বলেন, দেশে এখনো মানুষের মৌলিক অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাঁর মতে, গণভোটের ফলাফল অস্বীকার করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করার পরিণতি গুরুতর হতে পারে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেই প্রত্যাশা পূরণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা অপরিহার্য বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

গণভোট ও জুলাই সনদ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণ, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা এর সঙ্গে যুক্ত। জামায়াত আমিরের বক্তব্যে এসব বিষয়ে সরকারের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর মতে, জনগণের মতামত ও রাজনৈতিক সংস্কারের অঙ্গীকার যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

দেশের দুর্নীতি ও অনিয়মের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, সমাজে অন্যায়, দুর্নীতি এবং অনিয়ম ব্যাপকভাবে বেড়েছে। নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে যে প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, বাস্তবে পরিস্থিতি তার বিপরীত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, সমস্যা কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে। যদিও এ বক্তব্যের পক্ষে তিনি সম্মেলনে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেছেন কি না, তা প্রদত্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের প্রত্যাশার প্রসঙ্গও বক্তব্যে গুরুত্ব পায়। শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী এবং তরুণ সমাজ শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, বৈষম্য কমবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করবে। কিন্তু বর্তমান সরকার বৈষম্যের নতুন মাত্রা যোগ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শিক্ষাঙ্গনে দলীয়করণ, লুটপাট এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ভাগ বসানোর অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবর্তনের পরও মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে। শিক্ষাঙ্গনে নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষার্থীদের অধিকার এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দলীয় প্রভাবের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। তবে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান বা ঘটনার বিষয়ে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে সংশ্লিষ্ট তথ্য, নথি এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।

বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার বিচার ও শিক্ষা বিভাগের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দলীয়করণের মাধ্যমে আগের সরকারের পথ অনুসরণ করছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ নাগরিকের আস্থা তৈরির অন্যতম ভিত্তি। বিচারপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়াও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয়টি নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পূর্ণ শক্তি নিয়ে কাজ করে বিজয় অর্জনের জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তাঁর মতে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত হলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্ষমতাসীন বিএনপির পছন্দের ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে। এ কারণে দেশে কার্যত দুই ধরনের সরকারব্যবস্থা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি—একটি জনগণের ভোটের ভিত্তিতে, অন্যটি ক্ষমতাসীন দলের পছন্দ অনুযায়ী।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সড়ক ও নালা-নর্দমার উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অবকাঠামো, নাগরিক সেবা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব নির্বাচন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা না থাকলে সাধারণ মানুষ সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা তাই গুরুত্বপূর্ণ।

শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, পছন্দের ব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে বসিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হচ্ছে। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা প্রকল্পের নাম এবং যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রদত্ত বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নথি, প্রকল্পের হিসাব, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াত আমিরের এই আহ্বান দলটির রাজনৈতিক প্রস্তুতির দিকটিও সামনে এনেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি, জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে শুধু সাংগঠনিক শক্তি নয়, প্রার্থী নির্বাচন, স্থানীয় সমস্যার সমাধানে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং ভোটারদের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সব মিলিয়ে টঙ্গীর রুকন সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, দলীয়করণ, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, সংস্কার কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com