ঢাকা-কক্সবাজার রুটে নতুন স্বস্তি মহানগর এক্সপ্রেসে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে নতুন স্বস্তি মহানগর এক্সপ্রেসে

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকা থেকে পর্যটননগরী কক্সবাজার যাতায়াত আরও সহজ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও বিস্তৃত করতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে রেল যোগাযোগে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করা ‘মহানগর এক্সপ্রেস’ এবার যাত্রাপথ বাড়িয়ে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত চলাচল শুরু করছে। আজ সোমবার থেকে নতুন এই সার্ভিস চালু হওয়ায় শুধু ঢাকা ও কক্সবাজারের যাত্রী নয়, মাঝপথের বিভিন্ন জেলার মানুষের জন্যও তৈরি হচ্ছে সরাসরি রেলভ্রমণের নতুন সুযোগ।

বিশেষ করে নরসিংদী, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, লাকসাম ও ফেনীসহ রেলপথের মধ্যবর্তী এলাকার যাত্রীদের জন্য এই ট্রেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতদিন কক্সবাজার যেতে অনেক যাত্রীকে রুট পরিবর্তন, ট্রেন বদল কিংবা বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হতো। নতুন সার্ভিস চালু হলে এসব এলাকার যাত্রীরা একটি ট্রেনেই কক্সবাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন। এতে ভ্রমণের সময় ও খরচের পাশাপাশি দীর্ঘ যাত্রায় ট্রেন পরিবর্তনের বাড়তি ভোগান্তিও কমতে পারে।

কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ চালুর পর থেকে পর্যটকদের মধ্যে ট্রেনে ভ্রমণের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ও ‘পর্যটন এক্সপ্রেস’ নামে দুটি ট্রেন চলাচল করছে। এসব ট্রেন তুলনামূলকভাবে দ্রুত কক্সবাজারে পৌঁছানোর সুযোগ দিলেও মধ্যবর্তী অনেক স্টেশনে যাত্রাবিরতি না থাকায় ওইসব এলাকার যাত্রীদের জন্য সুবিধা সীমিত ছিল। নতুন মহানগর এক্সপ্রেস সেই জায়গায় ভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়ে আসছে। ট্রেনটি পথে একাধিক স্টেশনে থামবে, ফলে কক্সবাজারের সঙ্গে দেশের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সরাসরি রেল সংযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেস প্রতিদিন রাত সাড়ে ৮টায় ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। রাতভর যাত্রা শেষে ট্রেনটি পরদিন সকাল ৬টার দিকে কক্সবাজারের আইকনিক রেলস্টেশনে পৌঁছাবে। অর্থাৎ রাজধানী থেকে রাতের যাত্রা করে সকালে কক্সবাজারে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন যাত্রীরা। এতে দিনের কর্মব্যস্ততা শেষ করে রাতে ট্রেনে উঠে সকালে পর্যটন শহরে পৌঁছানোর একটি সুবিধাজনক ভ্রমণ পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে।

ফিরতি পথে কক্সবাজার থেকে প্রতিদিন সকাল ৯টায় ঢাকার উদ্দেশে ছাড়বে মহানগর এক্সপ্রেস। চট্টগ্রামে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে যাত্রাবিরতির পর ট্রেনটি ঢাকার পথে চলবে এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তবে সপ্তাহের প্রতি রোববার ট্রেনটির সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে। ফলে যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনা করার সময় সাপ্তাহিক বন্ধের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

নতুন এই সার্ভিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর যাত্রাবিরতির সংখ্যা। ঢাকা থেকে কক্সবাজারের পথে বিমানবন্দর, নরসিংদী, ভৈরব বাজার, আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, কসবা, কুমিল্লা, লাকসাম, নাঙ্গলকোট ও ফেনীসহ একাধিক স্টেশনে ট্রেনটি থামবে। বর্ধিত রুটে সীতাকুণ্ডের কুমিরা স্টেশনে মহানগর এক্সপ্রেসের যাত্রাবিরতি বাতিল করা হয়েছে। ফলে নতুন রুটে কোন স্টেশন থেকে যাত্রীরা উঠতে বা নামতে পারবেন, সে বিষয়ে আগেভাগে সময়সূচি দেখে টিকিট কেনা গুরুত্বপূর্ণ।

ট্রেনটির আসন সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। মহানগর এক্সপ্রেসে মোট ১৬টি কোচ রাখা হয়েছে এবং আসন সংখ্যা ৭০০ থেকে বাড়িয়ে ৭৩৬ করা হয়েছে। এর ফলে একসঙ্গে আরও বেশি যাত্রী ঢাকা-কক্সবাজার রুটে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। পর্যটন মৌসুম, সরকারি ছুটি কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির সময় কক্সবাজারে পর্যটকের চাপ বেড়ে গেলে অতিরিক্ত এই আসনসংখ্যা রেলপথে যাত্রী পরিবহনে কিছুটা বাড়তি সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।

ভাড়ার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন শ্রেণির আসনের জন্য আলাদা হার নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা-কক্সবাজার রুটে শোভন চেয়ার শ্রেণিতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৬৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে এসি ক্যাটাগরির সর্বোচ্চ ভাড়া ১ হাজার ৫৭০ টাকা পর্যন্ত। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম অংশে ভাড়ার পরিমাণ আরও কম। এই অংশে সর্বনিম্ন ভাড়া ২৪০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ৫৪৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে যাত্রীদের প্রয়োজন, আর্থিক সামর্থ্য ও ভ্রমণের ধরন অনুযায়ী আসনের শ্রেণি বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে।

টিকিট কেনার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে প্রচলিত নিয়মে। বাংলাদেশ রেলওয়ের অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা এবং স্টেশন কাউন্টার থেকে মহানগর এক্সপ্রেসের টিকিট সংগ্রহ করা যাবে। ঢাকা থেকে ২৬ অক্টোবরের যাত্রার টিকিট আগেই বিক্রি শুরু হওয়ায় প্রথম দিনেই ট্রেনটি নিয়ে যাত্রীদের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। একইভাবে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ২৭ অক্টোবরের যাত্রার টিকিটও বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

রেলওয়ের এই নতুন সার্ভিস শুধু যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে নয়, কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। পর্যটকদের একটি বড় অংশ এখন সড়কপথের পাশাপাশি রেলকে ভ্রমণের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন। ট্রেনে তুলনামূলক স্বস্তিদায়কভাবে দীর্ঘপথ ভ্রমণের সুযোগ থাকায় পরিবার, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে রেলপথের আকর্ষণ বাড়ছে। নতুন ট্রেনের মাধ্যমে যদি মধ্যবর্তী জেলা থেকে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে, তাহলে কক্সবাজারের হোটেল, রেস্তোরাঁ, পর্যটন পরিবহন, স্থানীয় বাজার এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদীর মতো জনবহুল এলাকার মানুষের জন্য কক্সবাজার ভ্রমণ আরও সরাসরি হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিবার নিয়ে বেড়াতে যাওয়া কিংবা স্বল্প সময়ের ছুটিতে সমুদ্রসৈকত দেখতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রেনের এই সংযোগ নতুন পরিকল্পনার সুযোগ করে দিতে পারে। একই সঙ্গে কক্সবাজারের বাইরে থাকা পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন।

কক্সবাজার রেলস্টেশন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর এক্সপ্রেস চালু হলেও আগে থেকে চলাচল করা কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ নতুন ট্রেন যুক্ত হওয়ায় ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেলসেবার পরিধি আরও বাড়বে। যাত্রীদের সামনে ভিন্ন সময়সূচি ও যাত্রাবিরতির ভিত্তিতে পছন্দ করার সুযোগও তৈরি হবে।

তবে নতুন সার্ভিসের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে নিয়মিত সময়সূচি বজায় রাখা, যাত্রীসেবার মান, টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারমুখী যাত্রীর চাপ বাড়লে টিকিটের চাহিদাও বাড়বে। এ সময় সুষ্ঠু টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং যাত্রীদের প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠবে।

ঢাকা-কক্সবাজার সরাসরি রেল যোগাযোগের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের পর্যটন খাতেও নতুন গতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু সমুদ্রসৈকত নয়, কক্সবাজারের আশপাশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও দেশি পর্যটকের যাতায়াত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রেলপথে যাত্রী পরিবহন বাড়লে সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে কক্সবাজারের রেল যোগাযোগ আরও সম্প্রসারিত হলে পর্যটন, ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

সব মিলিয়ে মহানগর এক্সপ্রেসের কক্সবাজার পর্যন্ত যাত্রা সম্প্রসারণ দেশের রেল যোগাযোগে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ, মধ্যবর্তী স্টেশনে যাত্রাবিরতি, তুলনামূলক বিভিন্ন শ্রেণির আসন এবং বিদ্যমান ট্রেনগুলোর পাশাপাশি নতুন সার্ভিস—সব মিলিয়ে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে যাত্রীদের সামনে তৈরি হচ্ছে আরও একটি বিকল্প। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা গেলে এই ট্রেন শুধু যাত্রীদের ভ্রমণ সহজ করবে না, বরং কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com