কড়া নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের নতুন চালান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের নতুন চালান
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাশিয়া থেকে আনা পারমাণবিক জ্বালানির আরও একটি চালান কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৭টা ৪৬ মিনিটে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়ামবাহী তিনটি গাড়ি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ চালান পৌঁছানোর খবর পাওয়া গেছে।

প্রকল্পের মতো সংবেদনশীল স্থাপনায় পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, নির্ধারিত সময়সূচি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ঢাকা থেকে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত জ্বালানি পরিবহনে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে চালানটি প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয় বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ৮টা ১৪ মিনিটে রাশিয়া থেকে আসা একটি বিশেষ কার্গো বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটিতে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহন করা হয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর জ্বালানিটি সড়কপথে রূপপুরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রম চলতি বছরের অক্টোবর থেকে শুরু করে ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটম। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, কয়েকটি বিশেষায়িত কার্গো ফ্লাইটে এসব জ্বালানি বাংলাদেশে আনার কথা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি পৌঁছানো বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে জ্বালানি দেশে আসা এবং সেটি ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা দুটি পৃথক বিষয়। জ্বালানি গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং প্রকল্পের অন্যান্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়। ফলে কোনো চালান পৌঁছালেই সংশ্লিষ্ট ইউনিট অবিলম্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প। এতে দুটি ইউনিট রয়েছে এবং প্রতিটি ইউনিটের পরিকল্পিত উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদনক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট।

দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ, উৎপাদনব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস হিসেবে যুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে প্রকল্পটির প্রকৃত অবদান নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি এবং জাতীয় গ্রিডে নির্ভরযোগ্যভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। উৎপাদনক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য থাকায় কেন্দ্রটির পূর্ণ সক্ষমতা কখন অর্জিত হবে, তা নির্ধারণে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

পারমাণবিক জ্বালানি সাধারণ পণ্য বা প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির মতো নয়। এর পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করতে হয়। এ ধরনের জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে।

রূপপুরে জ্বালানিবাহী গাড়িবহর পৌঁছানোর সময় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবেদনশীল অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা শুধু জ্বালানি পরিবহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি গ্রহণ থেকে শুরু করে রিঅ্যাক্টরের কার্যক্রম, বিকিরণ পর্যবেক্ষণ, ব্যবহৃত জ্বালানির ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলাসহ প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর নিয়মনীতি অনুসরণ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তামান এবং বাংলাদেশের প্রযোজ্য বিধিবিধান মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরবর্তী প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে। ২৭ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে প্রথম ইউনিটে বি-২ ধাপের ফিজিক্স পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরবর্তী ধাপে যেতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে হবে।

প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ—দুটি বিষয়ই প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু প্রতিটি ইউনিটের পরীক্ষা, অনুমোদন এবং চালুর সময়সূচি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।

রূপপুরের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছানো একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কার্যক্রম। আন্তর্জাতিক পরিবহন, বিশেষায়িত কার্গো ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত অতিক্রমের অনুমতি এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সমন্বয়ের ওপর এ ধরনের সরবরাহ নির্ভর করতে পারে। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য নির্ধারিত একটি জ্বালানিবাহী ফ্লাইট আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি-সংক্রান্ত জটিলতায় বিলম্বিত হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে রোসাটম অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহের সময়সূচি ঘোষণা করে।

এ পরিস্থিতি দেখায়, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে নির্মাণকাজের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে জ্বালানি পৌঁছানো প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। তবে জ্বালানি সরবরাহের অগ্রগতি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করাও সমান প্রয়োজনীয়।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহ দেশের বিদ্যুৎ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নিরাপদ পরিচালনা, কারিগরি সক্ষমতা, যথাযথ তদারকি এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী ঘোষণা ও অগ্রগতির তথ্যের ভিত্তিতেই কেন্দ্রটির উৎপাদন শুরুর সময় এবং জাতীয় গ্রিডে এর অবদান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com