ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে উদ্বেগ, প্রতিবাদ এবি পার্টির

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যে উদ্বেগ, প্রতিবাদ এবি পার্টির
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারের অনুমোদন পেলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না—পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বক্তব্যটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) বলেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনাকে এভাবে প্রকাশ্যে তুলে ধরা আইনের শাসন, মানবাধিকার ও নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি অবজ্ঞার শামিল।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এক যৌথ বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁরা আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দেশে আর কোনোভাবেই ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি ফিরে আসবে না—এমন সুস্পষ্ট অঙ্গীকারও দাবি করেছেন দলটির নেতারা।

বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত সোমবার রাজধানীর চকবাজারে একটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আইজিপির বক্তব্যকে ঘিরে। সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশের দায়িত্ব ও মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না। একই অনুষ্ঠানে তিনি নাগরিকদের আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থানের কথা বলতে গিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সম্ভাবনা সামনে আনার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতায় ক্রসফায়ার শব্দটি ঘিরে রয়েছে বহু বিতর্ক, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে মানুষের প্রাণহানির স্মৃতি।

এবি পার্টির নেতারা তাঁদের বিবৃতিতে বলেন, একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রধানের দায়িত্ব হলো অপরাধ প্রতিরোধ করা, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আদালতের বাইরে কাউকে হত্যা করার সম্ভাবনা তুলে ধরা কিংবা সরকারের অনুমোদনকে এ ধরনের পদক্ষেপের ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে তাঁরা মন্তব্য করেন।

তাঁদের মতে, সরকারের অনুমোদন থাকলেই কোনো নাগরিককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার বৈধতা তৈরি হয় না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা মানতে হয়। কোনো ব্যক্তি গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বিবৃতিতে অতীতের রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবি পার্টির নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে পুলিশের একটি অংশকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থী, নারী, শিশু ও শ্রমজীবী মানুষসহ নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলিবর্ষণ ও প্রাণহানির ঘটনাগুলো দেশের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

এবি পার্টির বক্তব্য অনুযায়ী, ওই অভিজ্ঞতার পর পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা তুলে ধরা জনমনে নতুন করে আশঙ্কা সৃষ্টি করতে পারে। তাঁদের প্রশ্ন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার সংস্কৃতি আবারও ফিরিয়ে আনার কোনো প্রবণতা তৈরি হচ্ছে কি না। তবে এটি দলটির উদ্বেগ ও রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতায় শুধু রাজনৈতিক দল নয়, নাগরিক অধিকার ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন মহলেও উদ্বেগ দেখা গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে তা প্রত্যাহার, নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সংস্থাটির প্রতিক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবিলার বিকল্প হিসেবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার বিপদ তুলে ধরা হয়েছে।

এ ধরনের প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আলোচনায় এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: অপরাধ দমনে রাষ্ট্র কতটা কঠোর হতে পারে, আর সেই কঠোরতার সীমা কোথায়? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন—এ বিষয়ে মতভেদ কম। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন ও জবাবদিহির সীমা অতিক্রম করা যাবে কি না, সেটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

আইনের শাসনের মূলনীতি অনুযায়ী, অপরাধের অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও রাষ্ট্রপক্ষের; সেই অভিযোগের বিচার করার দায়িত্ব স্বাধীন আদালতের। কাউকে গ্রেপ্তার করা, জিজ্ঞাসাবাদ করা কিংবা প্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বলপ্রয়োগও হতে হয় আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আদালতের বিকল্প হিসেবে পুলিশের কাজ করার সুযোগ নেই।

এ কারণে ক্রসফায়ার নিয়ে যেকোনো বক্তব্যের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নয়, আইনি ব্যাখ্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানও জরুরি। কোনো পরিস্থিতিতে পুলিশের বলপ্রয়োগের আইনগত সীমা কী, সরকার এ বিষয়ে কী নীতিগত অবস্থান নিয়েছে এবং আইজিপির বক্তব্যের তাৎপর্য কী—এসব প্রশ্নে স্পষ্টতা থাকলে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগের জবাব দেওয়া সহজ হতে পারে।

এবি পার্টির নেতারা আরও বলেন, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের বা সরকারের ব্যক্তিগত বাহিনী নয়; জনগণের জানমাল রক্ষা এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্বে নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করাই পুলিশের মূল অঙ্গীকার হওয়া উচিত। তাঁদের মতে, বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য অতীতের অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর বক্তব্য ও আচরণে সংযম, স্বচ্ছতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। কারণ পুলিশের প্রতি আস্থা শুধু অপরাধ দমনের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না; নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও তা নির্ভরশীল। কোনো ব্যক্তি অপরাধী বলে সন্দেহ করা হলেই তাঁকে দোষী ধরে নেওয়া কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে আইনের সমতার নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের অবিলম্বে ব্যাখ্যা দাবি করেছেন। তাঁদের আহ্বান, নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গুম, খুন, নির্যাতন ও বিচারহীনতার কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো মানুষের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তাঁরা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি আর ফিরে না আসার নিশ্চয়তা চেয়েছেন।

আইজিপির বক্তব্য নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এখন সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা আসা গুরুত্বপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকার সুরক্ষিত রাখাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং আইনের প্রতি আনুগত্য—দুটিকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে না দেখে একই কাঠামোর মধ্যে নিশ্চিত করাই হবে জনগণের আস্থা ধরে রাখার অন্যতম শর্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com