কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আজ মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ এ শুনানিকে কেন্দ্র করে মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের দিকে নজর রয়েছে। ২০১৮ সালের মে মাসে কথিত বন্দুকযুদ্ধে একরামুল হকের মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষের আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অবৈধভাবে আটক, অপহরণ, পরিকল্পিতভাবে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা এবং অপরাধ সংঘটনে নির্দেশ, প্ররোচনা ও সহায়তার অভিযোগ।
ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে শুনানিটি হওয়ার কথা। এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য থাকলেও ট্রাইব্যুনালের পূর্ণ বেঞ্চ না থাকায় তা পিছিয়ে ২৭ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মামলাটিতে ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার পর এখন অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হচ্ছে। এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করবে। আদালত অভিযোগ গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে মামলাটি পরবর্তী বিচারিক ধাপে এগোবে। তবে অভিযোগ গঠনের শুনানি মানেই আসামিদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হলে বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তি মূল্যায়ন করতে হবে।
মামলায় বর্তমানে চার আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাঁরা হলেন কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুব আলম এবং র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের নাম সংশ্লিষ্ট সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত মেজর রুহুল আমিন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আশেকুর রহমান এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদসহ সাতজনকে এ মামলায় পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২৫ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত শুনানিতে গ্রেপ্তার চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলেও অন্য সাতজন আত্মসমর্পণ করেননি বলে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন থেকে জানা যায়।
গত ২৬ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ একরামুল হক হত্যা মামলায় ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ট্রাইব্যুনাল সেদিন অভিযোগ আমলে নেন। এরপর অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য বিভিন্ন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন থাকলেও পূর্ণ বেঞ্চ না থাকায় তা আবার পিছিয়ে যায়। সর্বশেষ ২৭ অক্টোবর শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের কিরণতলীর হোটেল নেটংয়ের সামনের সড়ক থেকে একরামুল হককে তুলে নেওয়া হয় বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে। পরে রাত ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নোয়াখালিয়াপাড়ায় মেরিন ড্রাইভের সাগরতীর এলাকায় র্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। বর্তমান মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই ঘটনার পেছনে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর বিষয় ছিল।
একরামুল হক টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁর মৃত্যু সে সময় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটির পর তাঁর পরিবার ও স্বজনদের পক্ষ থেকে হত্যার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি ওঠে। পরবর্তী সময়ে এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসা একটি ফোনালাপও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। ঘটনাটি নিয়ে জনপরিসরে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, বর্তমান মামলার বিচারিক কার্যক্রম সেই প্রশ্নগুলোর আইনি নিষ্পত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগে বলা হয়েছে, একরামুল হককে অবৈধভাবে আটক ও অপহরণের পর বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই সঙ্গে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনে সংশ্লিষ্টতা, প্ররোচনা, সহায়তা এবং হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করবে। অন্যদিকে আসামিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি, তাঁদের সংশ্লিষ্টতা এবং ব্যক্তিগত দায়ের বিষয় বিচারিক প্রক্রিয়ায় বিবেচিত হবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযোগ গঠনের পর্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ পর্যায়ে আদালত নির্ধারণ করেন অভিযোগগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিচার এগিয়ে নেওয়ার ভিত্তি রয়েছে কি না। অভিযোগ গঠন করা হলে পরবর্তী সময়ে সাক্ষ্যগ্রহণ, সাক্ষীদের জেরা, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্কের মধ্য দিয়ে বিচার চলতে পারে। তবে মামলার পরবর্তী ধাপ ও সময়সূচি ট্রাইব্যুনালের আদেশের ওপর নির্ভর করবে।
এ ধরনের মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অভিযোগের গুরুত্বের পাশাপাশি প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনো আসামিকে দোষী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারও বিচারপ্রক্রিয়ার একটি মৌলিক বিবেচ্য বিষয়।
একরামুল হক হত্যার মামলায় আজকের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ কী যুক্তি উপস্থাপন করে এবং ট্রাইব্যুনাল কী আদেশ দেন, সেদিকেই নজর থাকবে। শুনানির ফলাফলের ভিত্তিতে মামলাটি পরবর্তী পর্যায়ে এগোবে কি না, তা স্পষ্ট হবে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচারিক অগ্রগতি একদিকে যেমন অভিযোগের আইনি নিষ্পত্তির পথ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে তেমনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রমাণভিত্তিক ও স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বও সামনে নিয়ে আসে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত