ইউসিবি হিসাব থেকে ৭০ দফায় ৩৩.৯০ লাখ টাকা উধাও

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
ইউসিবি হিসাব থেকে ৭০ দফায় ৩৩.৯০ লাখ টাকা উধাও
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির একটি শাখায় গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা অবৈধভাবে স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংক স্টেটমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ও ২৫ অক্টোবর দুই দিনে বিকাশের ‘অ্যাড মানি’ সেবার মাধ্যমে ৭০ দফায় ওই অর্থ স্থানান্তর করা হয়। ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ। তবে কারা, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ স্থানান্তর করেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ভুক্তভোগী গ্রাহক কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুজিবুল হক। তাঁর দাবি, তিনি নিজে কোনো অ্যাপ বা অনলাইন ব্যাংকিং কার্ড ব্যবহার করেন না। এমনকি অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে তাঁর মোবাইল ফোনে কোনো ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) বা বার্তাও আসেনি। এরপরও হিসাব থেকে এত বিপুল অর্থ চলে যাওয়ার ঘটনায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ঘটনাটি শুধু একজন গ্রাহকের আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ নয়; ব্যাংক হিসাবের নিরাপত্তা, ডিজিটাল লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষার ব্যবস্থাও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার। অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুজিবুল হক তাঁর এক কর্মচারীকে ঈদগাঁওয়ে ইউসিবির সংশ্লিষ্ট শাখায় টাকা উত্তোলনের জন্য পাঠান। কিন্তু কর্মচারীকে জানানো হয়, হিসাবটিতে টাকা নেই। বিষয়টি জানার পর তিনি নিজেই ব্যাংকে গিয়ে হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের কারণ জানতে চান।

ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, এ সময় শাখা ব্যবস্থাপক তাঁকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেন। পরে তিনি ঈদগাঁও থানায় জিডি করেন। এরপর বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়।

হিসাব থেকে অর্থ উধাও হওয়ার বিষয়টি জানার আগ পর্যন্ত কীভাবে এতগুলো লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, সে সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনের সময়, পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট বিকাশ হিসাব এবং অর্থের পরবর্তী গন্তব্য শনাক্ত করা গেলে ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

জিডির সূত্র ধরে সোমবার তদন্ত শুরু করেন সদর, রামু ও ঈদগাঁও সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান। তাঁর নেতৃত্বে তদন্তে ব্যাংক হিসাব থেকে একাধিক দফায় অর্থ স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে সোমবার সকালে ভুক্তভোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুজিবুল হকের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন এএসপি মাহমুদুল হাসান। পরে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি ডিরেক্টরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে জানা গেছে।

এএসপি মাহমুদুল হাসান বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুক্তভোগীর করা জিডির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপারের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এএসপি মাহমুদুল হাসানকে। তিনি ঈদগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এটিএম সিফাতুল মাজদারকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাটি খতিয়ে দেখছেন।

তদন্তে এখন মূলত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন: লেনদেনগুলো কীভাবে অনুমোদিত হয়েছে, ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত কোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, অর্থ কোন কোন বিকাশ হিসাবে গেছে এবং লেনদেনের পেছনে কোনো অননুমোদিত প্রবেশ বা পরিচয় অপব্যবহারের ঘটনা রয়েছে কি না। তবে এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা ব্যক্তিকে দায়ী করার সুযোগ নেই।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুজিবুল হক জানিয়েছেন, তিনি নিজে কোনো অ্যাপ বা অনলাইন ব্যাংকিং কার্ড ব্যবহার করেন না। তাঁর মোবাইল ফোনেও কোনো ওটিপি বা লেনদেনসংক্রান্ত বার্তা আসেনি বলে দাবি করেছেন তিনি। এ কারণে হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের ঘটনাটি তাঁর কাছে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

সাধারণত ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনে গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, অনুমোদন এবং সন্দেহজনক কার্যক্রম শনাক্ত করার জন্য বিভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়। তবে কোন সেবা বা লেনদেনে কী ধরনের যাচাই প্রযোজ্য, তা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার নিয়মের ওপর নির্ভর করে। এই ঘটনায় কীভাবে ৭০টি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, তা জানতে ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক সেবাদাতার লেনদেনের নথি, নিরাপত্তা লগ এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়া পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।

ভুক্তভোগীর বক্তব্য তাঁর অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ তুলে ধরে; অর্থ স্থানান্তরের প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে হলে স্বাধীনভাবে লেনদেনের নথি যাচাই করতে হবে। একইভাবে, ব্যাংক হিসাবের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো মাধ্যমে লেনদেনগুলো সম্পন্ন হয়েছে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

একজন গ্রাহকের হিসাব থেকে অল্প সময়ে ৭০ দফায় বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ ব্যাংকিং নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রাহক যদি লেনদেনগুলোর বিষয়ে অবগত না থাকেন, তাহলে কীভাবে প্রতিটি লেনদেন অনুমোদিত হয়েছে এবং কোনো অস্বাভাবিক কার্যক্রম শনাক্তের ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

এ ধরনের ঘটনায় ব্যাংকের লেনদেনের নথি সংরক্ষণ, গ্রাহকের অভিযোগ গ্রহণ, সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ পাওয়ার পর অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা গেলে তা উদ্ধার বা পরবর্তী অননুমোদিত লেনদেন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। তবে অর্থ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্তে প্রয়োজন হলে ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিকাশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রতিটি লেনদেনের সময়, প্রাপকের হিসাব, সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল রেকর্ড এবং অর্থ পরবর্তী সময়ে কোথায় স্থানান্তরিত হয়েছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ণয় করা সহজ হবে।

ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কীভাবে ভুক্তভোগীর হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা। একই সঙ্গে অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা, দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা প্রয়োজন, সেসব বিষয়ও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়ার কথা।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক স্টেটমেন্টে ৭০ দফায় মোট ৩৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা বিকাশ অ্যাড মানির মাধ্যমে স্থানান্তরের তথ্য রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে লেনদেনগুলো কে সম্পন্ন করেছে, কীভাবে অনুমোদন পেয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক ব্যবস্থায় কোনো নিরাপত্তাগত দুর্বলতা ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। ইউসিবি বা বিকাশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত বক্তব্যও প্রাপ্ত তথ্যের মধ্যে নেই।

পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তাই ঘটনার দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফল এবং যাচাই করা নথির ওপরই নির্ভর করতে হবে।

একজন গ্রাহকের হিসাব থেকে বিপুল অর্থ স্থানান্তরের এই অভিযোগ দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। তদন্তের মাধ্যমে অর্থের গন্তব্য শনাক্ত, সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া গেলে শুধু ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই নয়, ব্যাংকিং ও ডিজিটাল আর্থিক সেবার ওপর গ্রাহকদের আস্থাও রক্ষায় সহায়তা মিলবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com