যোগ্যতা পূরণেও আটকে শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
যোগ্যতা পূরণেও আটকে শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সরকারি কলেজে পাঠদান ও শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। অথচ প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জনের পরও তাঁদের অনেককে বছরের পর বছর একই পদে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের প্রভাষকদের পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে পদোন্নতির সরকারি আদেশ জারির দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন কর্মকর্তারা।

গত ২৫ অক্টোবর রাজধানীর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন পদোন্নতিবঞ্চিত প্রভাষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, চাকরিতে যোগদানের পর প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও অনেকের প্রথম পদোন্নতি হয়নি। অথচ তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন এবং বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা সম্পন্ন হওয়ার পরও সরকারি আদেশ জারি না হওয়ায় অনিশ্চয়তা কাটছে না।

শিক্ষা ক্যাডারের এই সংকটকে শুধু পদমর্যাদা বা বেতন বৃদ্ধির বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরকারি চাকরিতে পেশাগত অগ্রগতির ন্যায্যতা, জনবল ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং শিক্ষা খাতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা ধরে রাখার প্রশ্ন।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কর্মজীবন সাধারণত প্রভাষক পদ দিয়ে শুরু হয়। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে তাঁরা সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে পদোন্নতির সুযোগ পান। তবে পদোন্নতির জন্য ব্যক্তিগত যোগ্যতা অর্জনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পদে অনুমোদিত শূন্যপদ, জ্যেষ্ঠতা, চাকরির রেকর্ড এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হয়।

প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাধারণত নির্ধারিত মেয়াদে সন্তোষজনক চাকরি, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) সন্তোষজনক থাকা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার মতো শর্ত রয়েছে। শিক্ষা প্রশাসনসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৩৬তম, ৩৭তম ও ৩৮তম বিসিএসের অনেক কর্মকর্তা এসব শর্ত পূরণ করেছেন। তারপরও পদোন্নতির আদেশ না পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।

কর্মকর্তাদের প্রশ্ন, পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জনের পরও যদি দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে সেই যোগ্যতার বাস্তব মূল্য কোথায়? তাঁদের মতে, পদোন্নতি শুধু আর্থিক সুবিধা বাড়ায় না; এটি কর্মজীবনের অগ্রগতি, দায়িত্বের স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত।

শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি জটিলতার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে অনুমোদিত পদের সীমাবদ্ধতা। মাউশিসংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, সহকারী অধ্যাপক পদে শূন্যপদের সংখ্যা পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মকর্তাদের তুলনায় কম। ফলে যোগ্যতা পূরণ করলেও সবাইকে একসঙ্গে পদোন্নতি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সহকারী অধ্যাপক পদে ৯৪৯টি শূন্যপদের বিপরীতে পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তা রয়েছেন ১ হাজার ৬৮৪ জন। অর্থাৎ শূন্যপদের তুলনায় পদোন্নতির যোগ্য কর্মকর্তার সংখ্যা ৭৩৫ জন বেশি। এ ব্যবধানই পদোন্নতি নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতার একটি বড় কারণ।

তবে শুধু শূন্যপদের সংখ্যা দিয়ে পুরো সমস্যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কোন বিষয়ে কতটি পদ অনুমোদিত, কোথায় শূন্যপদ রয়েছে, জ্যেষ্ঠতার তালিকা কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত চলছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

একই ক্যাডারের বিভিন্ন বিষয়ে পদসংখ্যার পার্থক্য থাকলে এক বিভাগের কর্মকর্তা পদোন্নতি পেলেও অন্য বিভাগের যোগ্য কর্মকর্তাকে অপেক্ষা করতে হতে পারে। এ কারণে কর্মকর্তারা নিয়মিত ও স্বচ্ছ পদোন্নতি কাঠামোর পাশাপাশি পদসংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান চান।

পদোন্নতির সুযোগ বাড়াতে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংখ্যাতিরিক্ত বা সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানা গেছে। এ ধরনের পদ সাধারণ অনুমোদিত পদের বাইরে বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সৃষ্টি করা হয়। এর মাধ্যমে নিয়মিত পদের সীমাবদ্ধতা সাময়িকভাবে অতিক্রম করে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

তবে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি শুধু সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তে সম্পন্ন হয় না। এ ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে। পদ সৃষ্টির যৌক্তিকতা, আর্থিক প্রভাব, বিদ্যমান বিধিমালা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনবল কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অন্য কয়েকটি ক্যাডারে পদোন্নতির জটিলতা কমাতে অতিরিক্ত পদ সৃষ্টির নজির থাকলেও তাঁদের ক্ষেত্রে উদ্যোগটি এগোচ্ছে না। তবে বিভিন্ন ক্যাডারের পদকাঠামো ও বিধিমালা এক নয়। তাই তুলনামূলক আলোচনার পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডারের জন্য প্রযোজ্য নিয়ম, অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং প্রস্তাব আটকে থাকার নির্দিষ্ট কারণও স্পষ্ট করা জরুরি।

পদোন্নতির বিষয়ে গত ১৬, ১৭ ও ২১ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এসব সভায় পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের বিষয় পর্যালোচনা করা হলেও এখনো সরকারি আদেশ জারি হয়নি। এ কারণে তাঁরা দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছেন।

ডিপিসির সভা সম্পন্ন হওয়া এবং পদোন্নতির চূড়ান্ত সরকারি আদেশ জারি হওয়া প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পৃথক ধাপ। সভায় সুপারিশ বা সিদ্ধান্তের পর নথি যাচাই, অনুমোদন এবং আনুষ্ঠানিক আদেশ প্রকাশের কাজ থাকতে পারে। তবে এসব ধাপে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে তার কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে এবং বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভাও চলমান রয়েছে। তিনি দ্রুত পদোন্নতির আশা প্রকাশ করেছেন। অন্যান্য পদেও নিয়মিত পদোন্নতির ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

কর্মকর্তাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আশ্বাস কবে বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপ নেবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁরা পদোন্নতির প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি ও সময়সীমা দেখতে চান।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের একটি বড় অভিযোগ, একই সময়ে চাকরিতে যোগ দেওয়া অন্য কয়েকটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন, কিন্তু তাঁরা এখনো প্রভাষক পদে রয়েছেন। এ অবস্থাকে তাঁরা পেশাগত বৈষম্য হিসেবে দেখছেন।

তবে বিভিন্ন ক্যাডারের পদোন্নতির নিয়ম, পদসংখ্যা ও দায়িত্বের কাঠামো ভিন্ন হওয়ায় তুলনা করতে হলে এসব পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ক্যাডারে দীর্ঘদিন পদোন্নতি আটকে থাকলে তার কারণ ও সমাধানের পথ ব্যাখ্যা করা প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা শুধু প্রথম পদোন্নতি নয়, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও জটিলতার কথা বলছেন। তাঁদের অভিযোগ, উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগও সীমিত। অধ্যাপক পদকে গ্রেড-৩-এ উন্নীত করা এবং যোগ্য কর্মকর্তাদের উচ্চতর পদে যাওয়ার পথ সহজ করার দাবিও তাঁদের কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হলে একজন কর্মকর্তার আয়, পেশাগত স্বীকৃতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। একই পদে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বের সঙ্গে পদমর্যাদার সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব বিষয় কর্মকর্তাদের মনোবল এবং শিক্ষকতা পেশায় দীর্ঘমেয়াদি আগ্রহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি সংকট সমাধানে প্রথম প্রয়োজন পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের হালনাগাদ তালিকা, শূন্যপদের নির্ভুল হিসাব এবং আটকে থাকা নথির অবস্থান স্পষ্ট করা। কোন পর্যায়ে কতজনের পদোন্নতি সম্ভব, কোথায় অতিরিক্ত পদ প্রয়োজন এবং কোন অনুমোদন বাকি রয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে অনিশ্চয়তা কমবে।

একই সঙ্গে পদোন্নতির প্রক্রিয়ার জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি জানানো প্রয়োজন। সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব থাকলে তার আর্থিক ও প্রশাসনিক যৌক্তিকতা দ্রুত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের জট যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য নিয়মিত পদোন্নতি পরিকল্পনা ও জনবল কাঠামো পর্যালোচনার ব্যবস্থা দরকার।

শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দাবির সঙ্গে সরকারের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিধিবিধানের সমন্বয় করেই সমাধানে পৌঁছাতে হবে। পদোন্নতি যেন কেবল আন্দোলন বা চাপের পর এগোয়, এমন পরিস্থিতির বদলে একটি নিয়মিত, পূর্বানুমানযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

যাঁরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করেন এবং সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখেন, তাঁদের পেশাগত অগ্রগতির প্রশ্ন দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা কাম্য নয়। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও বিধিমালার ভিত্তিতে পদোন্নতির প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং কর্মকর্তাদের কাছে সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com