ইরানই যুদ্ধ শুরু করেছে, দাবি ট্রাম্পের

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৫ বার
ইরানই যুদ্ধ শুরু করেছে, দাবি ট্রাম্পের
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পক্ষে আবারও জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেনি; বরং তেহরানই ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে। একই সঙ্গে আগের যুদ্ধবিরতিকে ‘সময়ের অপচয়’ বলে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে যুদ্ধের সূচনা, সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা এবং সংঘাত বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের করিন্থে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব মন্তব্য করেন ট্রাম্প। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের অংশ হিসেবে আয়োজিত সমাবেশে তিনি ইরান নীতির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। আল–জাজিরাসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্যের এসব বিষয় উঠে এসেছে।

সমাবেশে ট্রাম্প রিপাবলিকান দলের এক আইনপ্রণেতার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। ওই আইনপ্রণেতা বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেনি, ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে। ট্রাম্পও একই অবস্থান তুলে ধরে ইরানের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের প্রেক্ষাপট হিসেবে উপস্থাপন করেন।

তবে সংঘাতের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুই দেশের বক্তব্য ও সামরিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ সামরিক হামলা শুরু করে। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ সামরিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং ইরানের নিরাপত্তা কর্মসূচিকে তাদের অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে তুলে ধরে। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে হামলা চালায়। এরপর পাল্টাপাল্টি হামলায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়।

অর্থাৎ, ট্রাম্পের বক্তব্য তাঁর প্রশাসনের অবস্থান তুলে ধরলেও যুদ্ধের সাম্প্রতিক পর্যায়ের সূচনা এবং তার আগের দীর্ঘদিনের বিরোধের ইতিহাস এক বিষয় নয়। দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের বৈরিতা, নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি—সব মিলিয়ে সংকটটি জটিল হয়ে উঠেছে।

সমাবেশে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য তিনি পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কার্যত আর কোনো বিকল্প ছিল না এবং এ ধরনের পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সামরিক অভিযানকে প্রয়োজনীয় ও বিলম্বিত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও কথা বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি জানান, সামরিক পদক্ষেপের পর জ্বালানি তেলের দাম আরও অনেক বেড়ে যেতে পারে বলে তাঁর ধারণা ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের যাতায়াত, পরিবহন ব্যয়, পণ্য সরবরাহ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচে প্রভাব ফেলে। ফলে যুদ্ধের সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি এর অর্থনৈতিক মূল্যও মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে তেলের দাম সম্পর্কে ট্রাম্পের বক্তব্য তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন। সংঘাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করছে সরবরাহ পরিস্থিতি, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা, উৎপাদন ও রপ্তানি, নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আগের যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য। তিনি বলেন, স্বল্প সময়ের জন্য কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি তাঁর কখনোই খুব একটা পছন্দ ছিল না। তাঁর বিবেচনায়, ওই ব্যবস্থা ছিল নিছক সময়ের অপচয়। এই মন্তব্যে সংঘাতের অবসানে কূটনৈতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সংশয় প্রকাশ পেয়েছে।

এর আগে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে দুই সপ্তাহের জন্য ঘোষিত ওই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ পরে বাড়ানো হয়। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেও বিভিন্ন পর্যায়ে হামলা, পাল্টা হামলা এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। ৮ জুলাই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন। ফলে সাময়িক বিরতি সংঘাতের স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি।

যুদ্ধবিরতি সাধারণত সামরিক উত্তেজনা কমানো, হতাহতের ঝুঁকি হ্রাস, মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং রাজনৈতিক আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি থাকলে এবং শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে এমন উদ্যোগ ভেঙে পড়তে পারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা সেই সমস্যারই ইঙ্গিত দেয়।

সমাবেশে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যেগুলো ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অস্ত্র দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো শহরেও হামলা চালানো সম্ভব হতে পারত। এই দাবি তুলে ধরে তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। দেশটির হাতে বিভিন্ন পাল্লার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যার কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের কিছু অংশে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা চালানোর মতো আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের বর্তমানে রয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ ও বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার ২০২৫ সালের মূল্যায়ন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান চাইলে তার বিদ্যমান মহাকাশ উৎক্ষেপণ প্রযুক্তির ভিত্তিতে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিকভাবে কার্যকর আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। এ ধরনের মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে সরাসরি হামলার সক্ষমতা সম্পর্কে ট্রাম্পের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত সামরিক তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।

তবে ইরানের আঞ্চলিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ড্রোন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব। এসব সক্ষমতা উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাতের বিস্তার ঘটাতে পারে এবং মার্কিন মিত্রদের নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, প্রকৃত সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নির্ধারণে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং স্বাধীন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ।

সামরিক অভিযানের পক্ষে ট্রাম্পের কঠোর বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বন্ধের আলোচনা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের খবর পাওয়া গেলেও স্থায়ী সমাধানের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির ইঙ্গিত স্পষ্ট নয়। আলোচনার শর্ত, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

ইরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডকে নিজেদের ও মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে। এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজার, বিমান চলাচল এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, খাদ্য এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়। যুদ্ধবিরতি টেকসই করতে হলে উভয় পক্ষের অঙ্গীকার, হামলা বন্ধের বাস্তব ব্যবস্থা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা জরুরি। একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এই অবস্থান সংঘাতকে আরও তীব্র করবে, নাকি আলোচনায় নতুন কোনো চাপ তৈরি করবে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যুদ্ধের দায় নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরে দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হবে কি না, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের প্রধান প্রশ্ন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com