বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে আগামী পাঁচ বছরে দেশের বেসরকারি খাতে প্রায় ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে জাপান। দেশটির মুদ্রা ইয়েনে এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফর এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ সামনে এসেছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পাবে। জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার আগাম প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাঁচ বছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আয়োজনের এই পরিকল্পনা দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে স্থান পেতে পারে।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগের লক্ষ্য হিসেবে গাড়ি উৎপাদনসহ বিভিন্ন শিল্প খাত এবং জ্বালানি অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে ঘোষিত বিনিয়োগের পুরো অর্থ ইতিমধ্যে দেশে এসেছে, কিংবা সব প্রকল্পের কাজ চূড়ান্ত হয়েছে—এমনটি নয়। পরিকল্পনাটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ চুক্তি, প্রকল্প অনুমোদন, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগের গুরুত্ব শুধু নতুন অর্থপ্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। জাপানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনাও এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়ি উৎপাদন ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পের পাশাপাশি জ্বালানি স্থাপনা নির্মাণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশে উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারক, পরিবহনসেবা, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ কারিগরি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় সম্পদ। কিন্তু জনসংখ্যাগত এই সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে মানসম্মত কর্মসংস্থান এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো গেলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি, যন্ত্র প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ ধরনের অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের পরিমাণ বড় হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্পের ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় উপকরণের অংশগ্রহণ এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর কর্মসংস্থানের পরিমাণ নির্ভর করবে। তাই বিনিয়োগের সাফল্য পরিমাপের ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো, কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো এবং দেশীয় শিল্প কতটা উপকৃত হলো, সেসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জাপানি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান সুমিতোমো করপোরেশনসহ কয়েকটি পক্ষের সম্পৃক্ততায় এ অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যোগাযোগব্যবস্থা ও অন্যান্য শিল্পসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হতে পারে। একই এলাকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কাঁচামাল সরবরাহ, পণ্য পরিবহন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং অন্যান্য সহায়ক সেবার বাজারও সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশের জন্য এ ধরনের বিনিয়োগের আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রকৌশল পণ্য, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস এবং অন্যান্য শিল্পপণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে উৎপাদন ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক রাখা, মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে দেশীয় শিল্পকে যুক্ত করা জরুরি।
বাংলাদেশ ও জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ। ২০১৪ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সময় এ উদ্যোগের সূচনা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো।
বর্তমানে এ উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করে বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ তৈরিতে বাংলাদেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সড়ক, রেল, নৌ ও সমুদ্রবন্দরভিত্তিক যোগাযোগ উন্নত হলে পণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ বাড়বে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা মেট্রোরেল এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। এসব প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে আরও কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা এবং অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ স্বাক্ষরের ফলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চুক্তির নথি প্রকাশ করা হয়েছে। দুই দেশের প্রত্যাশা, চুক্তিটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে এবং ব্যবসায়িক সহযোগিতা আরও সহজ হবে।
জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করা গেলে রপ্তানিকারকেরা নতুন ক্রেতা ও ব্যবসায়িক অংশীদার পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে উৎপাদন করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। তবে চুক্তির সুফল পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে দেশীয় উৎপাদকদের পণ্যের মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, শ্রমদক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপানি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আধুনিক উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন। পাশাপাশি বিনিয়োগ অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করা, নিয়মকানুন সংস্কার এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে নীতিগত স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা, দ্রুত অনুমোদন এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত প্রকল্পের সম্ভাব্য মুনাফার পাশাপাশি জমি পাওয়া, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, করব্যবস্থা, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পূর্বানুমানযোগ্যতা বিবেচনা করেন। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা বা অনিশ্চয়তা থাকলে ঘোষিত বিনিয়োগ বাস্তবায়নে বিলম্ব হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই প্রস্তাবিত ৬ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে কার্যকর প্রকল্পে রূপান্তর করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। কোন খাতে কত অর্থ বিনিয়োগ হবে, কোন প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা কী এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জাপানি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে বিনিয়োগের সুফল অর্থনীতির আরও বিস্তৃত অংশে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখন সেই সম্পর্ককে আরও বেশি বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগকেন্দ্রিক অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং দক্ষ কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ঘোষণার পর কত দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং তার সুফল কতটা সাধারণ মানুষের জীবন ও দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতিতে পৌঁছায়, তার ওপর।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত