সার্বিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবিরের পরাজয়কে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এই ফলাফলকে সার্বিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষের বিজয় হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেছেন, এটি বাংলাদেশের মানুষসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সার্বিয়ার জনগণকে অভিনন্দন জানান নাহিদ ইসলাম। সেখানে তিনি ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ভূমিকা তুলে ধরেন এবং তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত উদ্যোগের শক্তির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর পোস্টে বলা হয়, ‘জেন-জি যখন জেগে ওঠে, ইতিহাস তখন এগিয়ে যায়।’
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সার্বিয়ায় ছাত্রসমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য জয় পেয়েছে। প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, দেশটির দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা আলেকজান্ডার ভুসিসের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের তালিকা। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দেশটির বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের উদ্যাপনের খবরও সামনে এসেছে।
নিজের পোস্টের শুরুতে নাহিদ ইসলাম লেখেন, ‘সার্বিয়ায় ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে!’ এরপর তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় দুই বছর ধরে চলা বিক্ষোভের পর ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে আলেকজান্ডার ভুসিসের রাজনৈতিক শিবির নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছে।
নাহিদ ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ফলাফল কেবল ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের বিজয় নয়; বরং সার্বিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষেরও জয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষসহ দেশের সীমানার বাইরের বহু মানুষের জন্য এটি অনুপ্রেরণা বলে তিনি উল্লেখ করেন। পোস্টে সার্বিয়ার জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন এনসিপির এই নেতা।
তাঁর বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রথমত, দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা। দ্বিতীয়ত, তরুণদের সংগঠিত অংশগ্রহণ যে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেই ধারণা। তবে সার্বিয়ার নির্বাচনী ফলাফল ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়; দুই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো, আন্দোলনের ইতিহাস এবং নির্বাচনী পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সার্বিয়ার সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের নভেম্বরে দেশটির নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনে ছাউনি ধসে প্রাণহানির ঘটনার পর। ওই ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে শিশুও ছিল। দুর্ঘটনার পর নির্মাণকাজের মান, সংস্কার প্রকল্পের তদারকি এবং সরকারি জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে এমন বিপর্যয় ঘটেছে এবং ঘটনার দায় নির্ধারণে যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁরা তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর দাবি জানান। এসব দাবি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ধীরে ধীরে বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিক এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। বিক্ষোভের পরিসর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের জবাবদিহি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে সার্বিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলেছে।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনের পর ছাত্রসমর্থিত গোষ্ঠী রাজপথের প্রতিবাদকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ দেয়। ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামে পরিচিত এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশার প্রার্থীরাও ছিলেন। প্রার্থী বাছাইয়ে শিক্ষার্থীদের সমাবেশ ও আলোচনার ভূমিকা ছিল বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্দোলনটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। তবে আন্দোলনটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো একক নেতাকেন্দ্রিক কাঠামোয় পরিচালিত হয়নি। ফলে নির্বাচনে জয়ের পর সরকার গঠন, নেতৃত্ব নির্ধারণ এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রশ্ন সামনে এসেছে।
২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আগাম সংসদ নির্বাচনের পর প্রাথমিক ফলাফলে ছাত্রসমর্থিত প্রার্থীদের তালিকা এগিয়ে রয়েছে। প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার ভিত্তিতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ প্রায় ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে আলেকজান্ডার ভুসিসের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে প্রায় ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। ওই হিসাব অনুযায়ী, ২৫০ আসনের সংসদে ছাত্রসমর্থিত তালিকার আসনসংখ্যা প্রায় ১৩৯ এবং ক্ষমতাসীন জোটের আসনসংখ্যা প্রায় ৯৭ হতে পারে। চূড়ান্ত সরকারি ফলাফলে সংখ্যায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।
নির্বাচনের ফলাফলের পর ভুসিস তাঁর রাজনৈতিক শিবিরের পরাজয় স্বীকার করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ২০১৪ সাল থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ প্রভাবের অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং কার্যকর সরকার গঠন দুটি আলাদা ধাপ। নতুন সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছাত্রসমর্থিত প্রতিনিধিদের সামনে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো আরও স্পষ্ট হবে।
সার্বিয়ার আন্দোলন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে মূলত দীর্ঘস্থায়ী নাগরিক প্রতিবাদ, দুর্নীতিবিরোধী দাবি এবং নির্বাচনী অংশগ্রহণের সমন্বয়ের কারণে। আন্দোলনটি শুধু শিক্ষার্থীদের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের দাবি সামনে এসেছে।
তবে নির্বাচনে জয়কে আন্দোলনের সব লক্ষ্য পূরণের সমতুল্য বলা যায় না। দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রশাসনিক সংস্কার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং নাগরিকদের আস্থা পুনর্গঠন করতে হলে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল বিষয়গুলোও নতুন নেতৃত্বের সামনে থাকবে।
ছাত্রসমর্থিত আন্দোলনের নেতৃত্ব কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আন্দোলনের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হতে পারে। আবার নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রতিফলিত করা প্রয়োজন হবে।
নাহিদ ইসলামের অভিনন্দন বার্তায় সার্বিয়ার ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত উদ্যোগ ও ইতিহাসের গতিপথে তাদের ভূমিকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টটির মাধ্যমে তিনি সার্বিয়ার জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
তবে সার্বিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হলে শুধু নির্বাচনী জয় বা আন্দোলনের জনপ্রিয়তার দিকে তাকালেই চলবে না। আন্দোলনের কারণ, নাগরিকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং পরিবর্তনের পর জবাবদিহি কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিক অংশগ্রহণের পাশাপাশি অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।
সার্বিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তবে আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, জনগণের আস্থা রক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর। নাহিদ ইসলামের অভিনন্দন বার্তায় যে অনুপ্রেরণার কথা বলা হয়েছে, তার বাস্তব তাৎপর্যও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে এসব পরিবর্তন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ভিত্তিতে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত