সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ১২ লাখ কোটি টাকার দ্বারপ্রান্তে

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৩১ বার
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ১২ লাখ কোটি টাকার দ্বারপ্রান্তে

প্রকাশ:  ২৮ অক্টোবর  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকায়। গত ১ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি ছিল ১১ লাখ ৯৫ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১০ লাখ ২৭ হাজার ২৩২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। ঋণের বড় অংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বাজেটের বিপুল ব্যয় এবং সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত তথ্য এবং চলতি অর্থবছরের বাজেটের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, সরকারের ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভর্তুকি এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাজেটে যে পরিমাণ রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, বাস্তবে সেই পরিমাণ অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ব্যয় ও আয়ের ব্যবধান পূরণে ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক একটি অংশ। তবে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকলে এবং সেই ঋণ থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না এলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে। এতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রধান উৎস এখন ব্যাংক খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ১৩ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের স্থিতি ৯৮ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা।

অর্থাৎ সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ এসেছে ব্যাংক খাত থেকে। ব্যাংকব্যবস্থার বাইরে সরকারের ঋণ রয়েছে সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন আর্থিক উৎসে। এসব উৎসের মধ্যে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত, জাতীয় সঞ্চয় স্কিম এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ ঋণ উপকরণ রয়েছে।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। অর্থবছরের জুলাই থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে নিট ২৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। ফলে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের কিছু বেশি সময়েই বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্যবহার হয়ে গেছে।

এখানে নিট ঋণ বলতে নতুন ঋণ গ্রহণের বিপরীতে পরিশোধিত ঋণের হিসাব সমন্বয়ের পর যে পরিমাণ ঋণ বৃদ্ধি পায়, সেটিকে বোঝানো হয়। তাই সরকারের মোট ঋণস্থিতি এবং নির্দিষ্ট সময়ে নতুন করে নেওয়া ঋণের পরিমাণ এক নয়। এই পার্থক্য বিবেচনায় রেখেই ঋণের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ার অন্যতম কারণ রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান। চলতি অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই ও আগস্টে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আদায়ের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়ের এই ঘাটতি সরকারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ায়। কারণ বাজেটে নির্ধারিত ব্যয়ের অনেকগুলো খাত নিয়মিত অর্থায়ন দাবি করে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন জরুরি ব্যয় সহজে কমানো যায় না। আবার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যও অর্থ প্রয়োজন হয়। ফলে রাজস্ব আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়লে সরকারকে বিকল্প অর্থায়নের পথ খুঁজতে হয়।

অভ্যন্তরীণ ঋণ সেই বিকল্পগুলোর অন্যতম। তবে রাজস্ব আদায় বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করে বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হতে পারে। এ কারণে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সরকারের ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সুদ পরিশোধের দায়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ এই খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

আগের অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়। অর্থাৎ সরকারের মোট ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদ পরিশোধ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

ঋণের সুদ পরিশোধ একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়। নির্ধারিত সময়ে সুদ ও আসল পরিশোধ করতে না পারলে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই বাজেটে সুদ পরিশোধের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে।

সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন পুরোনো ঋণের দায় মেটাতে সরকারকে আবার নতুন ঋণ নিতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ঋণের বোঝা কমানোর পরিবর্তে তা ধরে রাখা বা আরও বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে নতুন ঋণের অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেই ব্যয় থেকে কতটা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কতটা বাড়ছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ না করে ঋণ বৃদ্ধির সামগ্রিক প্রভাব নির্ধারণ করা যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকবহির্ভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ খাতে সরকারের ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র খাতে ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।

সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার ব্যক্তি ও পরিবারের সঞ্চয় থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এই অর্থ সরকারের বাজেটের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। অন্যদিকে সঞ্চয়কারীরা নির্ধারিত শর্তে মুনাফা পান। ফলে সঞ্চয়পত্রের ঋণ একদিকে সরকারের অর্থায়নের উৎস, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মুনাফা ও আসল পরিশোধের দায়।

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের হিসাব বুঝতে ব্যাংকঋণ, সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য উৎসের ঋণকে আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি উৎসের সুদের হার, মেয়াদ, অর্থায়নের শর্ত এবং অর্থনীতিতে প্রভাব এক নয়। ঋণের উৎসের বৈচিত্র্য থাকলে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ে, তবে সামগ্রিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনা অপরিহার্য।

সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ সীমিত থাকলে এবং সরকার তুলনামূলক আকর্ষণীয় শর্তে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করলে কোনো কোনো পরিস্থিতিতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি কঠিন হতে পারে। অর্থনীতিতে এই সম্ভাব্য প্রভাবকে সাধারণভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ সংকোচন বা ‘ক্রাউডিং আউট’ বলা হয়।

তবে সরকারি ঋণ বাড়লেই বেসরকারি খাতের ঋণ কমবে—এমন সিদ্ধান্ত সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ব্যাংকব্যবস্থায় তারল্যের অবস্থা, ঋণের চাহিদা, সুদের হার, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং আর্থিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে। তাই সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখাও নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিভিন্ন কারণে সরকারের ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। অন্যদিকে অদূর ভবিষ্যতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার সম্ভাবনা সীমিত। এমনকি আগের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ, ব্যয়ে সাশ্রয় এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের এ ধরনের পরামর্শের বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, প্রকল্পের মান যাচাই, ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল অবকাঠামোর মতো খাতে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ঋণ থেকে পাওয়া অর্থের সুফল বাড়তে পারে।

সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর বিষয়টি তাই শুধু একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি রাজস্ব আদায়, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ ব্যয় পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ঋণকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে হলে আয় বাড়ানো, ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি না হলে ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ ভবিষ্যৎ বাজেটের জন্য আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com