মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর জেরুজালেমে নিজ দল লিকুদ পার্টির সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ‘লিকুদ দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। আমরা একটি শক্তিশালী নতুন জাতীয় সরকার গড়ব।’ তবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে সরকার গঠনের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা দেওয়া আগাম হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনের ফল নিয়ে ইসরায়েলের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। চ্যানেল ১২-এর হালনাগাদ জরিপে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫২টি আসনে এবং বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবির ৪৯টি আসনে এগিয়ে থাকার আভাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে, চ্যানেল ১১ ও চ্যানেল ১৩-এর জরিপে দুই শিবিরের আসনসংখ্যা প্রায় সমান দেখা যায়। আরবভিত্তিক দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৭ থেকে ১৯টির মধ্যে থাকতে পারে বলে বিভিন্ন জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এসব হিসাব প্রাথমিক; চূড়ান্ত ফলের সঙ্গে এর পার্থক্য হতে পারে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন। কিন্তু প্রাথমিক জরিপে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা তাঁর বিরোধী শিবির—কোনোটিই এককভাবে সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি।
এ কারণে নির্বাচনে কে বেশি আসন পেল, শুধু তা দিয়েই পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় দলগুলো নির্বাচনে আসন পাওয়ার পর অন্য দলের সঙ্গে আলোচনা করে জোট গঠন করে। তাই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা, সম্ভাব্য অংশীদারদের অবস্থান এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে এগিয়ে থাকলেও বৃহত্তর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুকে অন্য দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটও সরকার গঠনের চেষ্টা চালানোর কথা জানিয়েছেন। ফলে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর দুই শিবিরের মধ্যে আলোচনা ও দর-কষাকষি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নির্বাচনের পরপরই কোনো পক্ষের সরকার গঠনের পথ নিশ্চিত না হওয়ায় ইসরায়েলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনেও দুই নেতার পাল্টাপাল্টি দাবি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জটিলতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
সমর্থকদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু স্পষ্ট করেন, আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার পথে তিনি যেতে চান না। অথচ নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আরবভিত্তিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পেতে পারে। ফলে সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরব দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব দেশটির আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এবারের নির্বাচনে তাদের সম্মিলিত আসনসংখ্যা আগের তুলনায় বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এই ফল চূড়ান্ত হলে সংসদে আইন প্রণয়ন ও সরকার গঠনের আলোচনায় তাদের প্রভাব বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আসনসংখ্যা বেশি হলেই কোনো দল বা জোট সরকার গঠনে অংশ নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবস্থান, নীতিগত মতপার্থক্য এবং সম্ভাব্য জোটের শর্ত এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
আরব দলগুলোর সমর্থন প্রত্যাখ্যান করার নেতানিয়াহুর বক্তব্যের বিপরীতে বিরোধী শিবিরের সামনে প্রশ্ন রয়েছে, তারা কি আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের চেষ্টা করবে? এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নির্বাচনের ফল এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
নেতানিয়াহুর পাশাপাশি বিরোধী জোটের নেতা ও ইয়াশার দলের প্রধান গাদি আইজেনকটও সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি ভোটারদের চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তাঁর দাবি, দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
আইজেনকট নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান জানিয়ে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার কথাও বলেন। তাঁর মতে, নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতির পর আবারও নির্বাচন আয়োজন করা বড় ধরনের ভুল হবে।
সরকার গঠনের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে আইজেনকট বলেন, তিনি বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে একটি দায়িত্বশীল জায়োনিস্ট সরকার গঠনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। তবে তাঁর এই বক্তব্যও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে; নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল এবং সম্ভাব্য জোটের সমীকরণই নির্ধারণ করবে তাঁর সামনে বাস্তবে কতটা সুযোগ রয়েছে।
বিরোধী শিবিরের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো, নেতানিয়াহুর বিরোধিতায় একমত হলেও সরকার গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করা। আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা, অন্যান্য বিরোধী দলের শর্ত এবং নীতিগত মতপার্থক্য এ আলোচনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে বুথফেরত জরিপে রাতের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হিসাব সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে বিরোধী শিবির এগিয়ে থাকার আভাস মিললেও পরে কয়েকটি জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের অবস্থান শক্তিশালী হতে দেখা যায়। আবার অন্য জরিপে দুই শিবিরের মধ্যে প্রায় সমতা দেখা গেছে।
এ কারণে বুথফেরত জরিপকে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। ভোট গণনা সম্পন্ন হওয়া, আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ এবং আসন বণ্টন নিশ্চিত হওয়ার পরই রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হবে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারি ফলের ভিত্তিতে দলগুলোকে সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ নির্ধারণ করতে হবে।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগেরও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক ফলের পর তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে এমন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবেন। নির্বাচনের ফল অনুযায়ী কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সমর্থন সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পদক্ষেপের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। এবারের নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি একক দল হিসেবে এগিয়ে থাকার আভাস পেলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরও এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমায় পৌঁছাতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া স্থিতিশীল সরকার গঠন কঠিন হতে পারে। আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা এবং তাদের সঙ্গে অন্যান্য দলের সম্পর্কও এ সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের ফলাফল শুধু পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নীতি, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ভবিষ্যৎও সম্পর্কিত। নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর ‘শক্তিশালী নতুন জাতীয় সরকার’ গঠনের ঘোষণা তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যয়ের প্রতিফলন। কিন্তু সেই প্রত্যয় বাস্তবে রূপ দিতে হলে তাঁকে সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। একই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন বিরোধী নেতা আইজেনকটও। এখন চূড়ান্ত ভোটের ফল এবং পরবর্তী জোট আলোচনা নির্ধারণ করবে, ইসরায়েল কোন রাজনৈতিক পথে এগোবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত