লেক দূষণের উৎস বন্ধে রাজউকের কঠোর পদক্ষেপ

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২২ বার
লেক দূষণের উৎস বন্ধে রাজউকের কঠোর পদক্ষেপ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
 রাজধানীর লেক ও জলাশয়গুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে ভবনের পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। অনুমোদিত নকশায় সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নির্মাণের ব্যবস্থা রয়েছে, এমন ভবনগুলোর মালিকদের আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না করলে ইমারত নির্মাণ আইন ও ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক কারিগরি কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজউকের আওতাধীন এলাকার লেকগুলোকে দূষণমুক্ত রাখা, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে সভাটির আয়োজন করা হয়। সভায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, সিটি করপোরেশন এবং গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন আবাসিক এলাকার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল ও স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) নির্মাণের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ পাওয়া ১ হাজার ২৬৯টি ভবনের তালিকা সংশ্লিষ্ট আবাসিক সোসাইটিগুলোকে সরবরাহ করা হবে। একই সঙ্গে সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েলের কাঠামোগত নকশা রাজউকের অনুমোদন নিতে হবে। এ-সংক্রান্ত আবেদন পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকার লেক, খাল ও জলাশয়ে পয়োবর্জ্য মিশে যাওয়া দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সমস্যা। পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠার পরও অনেক ভবনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় দূষিত পানি সরাসরি ড্রেন, খাল কিংবা লেকে প্রবেশ করছে বলে বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনের মতো এলাকায় লেকের পানি দূষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এসব জলাশয় শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান নয়; নগরের পানি নিষ্কাশন, পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

লেকের পানিতে পয়োবর্জ্য মিশলে পানির গুণগত মান নষ্ট হয়। পানিতে দুর্গন্ধ সৃষ্টি, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং মশাসহ বিভিন্ন সমস্যার বিস্তার ঘটতে পারে। দূষিত পানি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে জলাশয়ের দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়, দূষণের উৎস বন্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাজউকের কারিগরি কমিটির সভায় দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, পানির গুণগত মান উন্নত করা, বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে ভবন পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি দূর করার উদ্যোগ আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো, চূড়ান্ত নোটিশ পাওয়া ১ হাজার ২৬৯টি ভবনের তালিকা সংশ্লিষ্ট আবাসিক সোসাইটিগুলোকে সরবরাহ করা। এসব ভবনে সেপটিক ট্যাংক, সোক ওয়েল অথবা স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তালিকা সংশ্লিষ্ট সোসাইটিগুলোর কাছে পৌঁছালে কোন ভবনগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তা চিহ্নিত করা এবং ভবনমালিকদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়তা মিলতে পারে। আবাসিক এলাকার প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার ফলে নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট ভবনগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণও সহজ হতে পারে।

তবে শুধু নোটিশ প্রদান বা তালিকা হস্তান্তরের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। কোন ভবনে কী ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা প্রয়োজন, কোথায় নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে এবং কোন ভবনে এখনো কাজ বাকি রয়েছে, সেসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে ভবনমালিকদেরও নিজেদের অনুমোদিত নকশা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব ভবনে নকশা অনুযায়ী সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নির্মাণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের দায় সংশ্লিষ্ট মালিকদের ওপরই বর্তায়।

সেপটিক ট্যাংক ও সোক ওয়েল নির্মাণের ক্ষেত্রে কাঠামোগত নকশার অনুমোদন রাজউক থেকে নিতে হবে। তবে আবেদন জমা দেওয়ার পর দীর্ঘসূত্রতা যেন নির্মাণকাজে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য আবেদন পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্মাণকাজের ক্ষেত্রে কাঠামোগত নকশা গুরুত্বপূর্ণ। সেপটিক ট্যাংকের ধারণক্ষমতা, অবস্থান, নির্মাণের নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বিবেচনায় উপযুক্ত নকশা প্রয়োজন। একইভাবে সোক ওয়েলের নির্মাণও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলগত শর্ত, মাটির বৈশিষ্ট্য এবং প্রযোজ্য বিধিমালা অনুসারে হওয়া দরকার।

অনুমোদনপ্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হলে ভবনমালিকেরা দ্রুত কাজ শুরু করার সুযোগ পাবেন। এতে একদিকে যেমন আইন মেনে নির্মাণ নিশ্চিত করা সহজ হবে, অন্যদিকে তেমনি প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কাজ পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও কমতে পারে।

এ ক্ষেত্রে রাজউকের দায়িত্ব হবে আবেদনগুলো দ্রুত ও যথাযথভাবে যাচাই করা। আর ভবনমালিকদের নিশ্চিত করতে হবে, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণকাজ হচ্ছে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে।

সভায় জানানো হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ শুরু না করলে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এ ক্ষেত্রে কোন ভবনের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে, তা সংশ্লিষ্ট নোটিশ, ভবনের অনুমোদিত নকশা এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। ভবনমালিকদের জন্য তাই সময়সীমা মেনে কাজ শুরু করার পাশাপাশি অনুমোদন ও নির্মাণসংক্রান্ত কাগজপত্র হালনাগাদ রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার উদ্দেশ্য কেবল আইন প্রয়োগ নয়; বরং ভবন থেকে নির্গত পয়োবর্জ্য যাতে অপরিশোধিত অবস্থায় লেক ও খালে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। এ কারণে আইনগত পদক্ষেপের পাশাপাশি সচেতনতা, কারিগরি সহায়তা এবং নিয়মিত তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর, রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিন ও মো. সারোয়ার আলম এবং রাজউকের সদস্য এরাদুল হক।

এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রফিকুল হাসান এবং প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কে এম মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর সভায় অংশ নেন। গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত ও সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান সুমন, বারিধারা সোসাইটির প্রেসিডেন্ট সাকিফ এ তাবানী ও সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মতিন, বনানী সোসাইটির প্রেসিডেন্ট শওকত আলী ভূঁইয়া দিলন এবং নিকেতন সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল রেজাউল করিম চৌধুরী আরিফসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর লেক ও জলাশয় রক্ষায় নতুন নির্দেশনা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করা, অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা এবং পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা কার্যকর রাখা—প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। ভবনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিক করা হলেও যদি আশপাশের ড্রেনেজব্যবস্থা অপরিকল্পিত থাকে, কিংবা অন্য উৎস থেকে দূষিত পানি লেকে প্রবেশ করতে থাকে, তাহলে দূষণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাই ভবনভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি লেক, খাল, ড্রেন এবং সামগ্রিক পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।

রাজধানীর জলাশয়গুলোকে সুস্থ ও ব্যবহারোপযোগী পরিবেশের অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারি সংস্থার তদারকি, ভবনমালিকদের দায়িত্বশীলতা এবং আবাসিক সোসাইটিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজউকের নতুন সিদ্ধান্ত সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি পদক্ষেপ। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী তদারকির মাধ্যমে দূষণ কমানোর অগ্রগতি কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com