প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের রাউজানে গত দুই বছরে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বাড়ির সামনে, বাজারের দোকানে কিংবা ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে হামলা ও গুলির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে চলতি বছরের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাউজানে ৩৫ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জন রাজনৈতিক বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের পাশাপাশি বালু-মাটির ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, খাল ও বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা এবং ঠিকাদারি কাজ ঘিরে বিরোধও এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রাখছে। বিএনপির দুই নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারীদের মধ্যকার বিরোধও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। তবে দুই নেতাই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেও নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
৫ আগস্টের পর রাউজানে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত হয় বলে স্থানীয়দের দাবি। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ১০ জন এবং গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত পাঁচজন রয়েছেন। তবে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের কারণ এক নয় এবং সব ঘটনায় রাজনৈতিক বিরোধই সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও কঠিন। বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে ব্যবসায়িক বিরোধ ও স্থানীয় আধিপত্যের প্রশ্নও উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে হত্যার মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট-পরবর্তী ধারাবাহিক প্রাণহানির শুরু। রাউজান পৌরসভার চারা বটতল বাজারে তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একই বছরের ২৯ অক্টোবর নিখোঁজের চার দিন পর উরকিরচরের মইশকরম এলাকায় আজম খানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১১ নভেম্বর নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় হাফেজ মাওলানা আবু তাহেরের মরদেহ।
২০২৫ সালেও একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২৪ জানুয়ারি জুমার নামাজে যাওয়ার পথে গুলিতে নিহত হন নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় যুবলীগ কর্মী মুহাম্মদ হাসানকে। ১৫ মার্চ হলদিয়া ইউনিয়নের আমিরহাট বাজারে ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয়ে ব্যানার সরানো নিয়ে বিরোধের জেরে মারধর ও ছুরিকাঘাতে নিহত হন যুবদল কর্মী কমর উদ্দিন, যিনি জিতু নামে পরিচিত ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এরপর ২১ মার্চ পূর্ব গুজরায় রুবেল, ৪ এপ্রিল হলদিয়ায় নূর আলম বকুল, ১৯ এপ্রিল বাগোয়ানে প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ এবং ২২ এপ্রিল গাজীপাড়ায় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ ইব্রাহিম নিহত হন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইব্রাহিম একটি চায়ের দোকানে বসে থাকার সময় তিনটি অটোরিকশায় আসা একদল যুবক তাকে গুলি করে হত্যা করে।
পরবর্তী সময়ে সংঘাত আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়। ৬ জুলাই কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাটে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলের সদস্যসচিব মো. সেলিমকে। হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়ভাবে রায়হান আলমের নাম আলোচনায় আসে। এর দুই দিন পর তাঁর বন্ধু দিদারুল আলমের মরদেহ রাঙামাটির কাউখালীর একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বও জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর হাটহাজারীর মদুনাঘাট সেতুর কাছে গুলিতে নিহত হন ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম। তাঁর পরিবারের দাবি ছিল, তিনি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন। এ ঘটনার সঙ্গে কর্ণফুলীকেন্দ্রিক বালুমহাল ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি আলোচনায় আসে। ঘটনায় হাজি মুহাম্মদ জসিমের নাম আলোচনায় আসার পর তিনি দেশ ছেড়েছেন বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়।
২৫ অক্টোবর চারা বটতল এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী আলমগীর আলমকে। এরপর ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পূর্ব গুজরায় নিহত হন যুবদলের সাবেক নেতা জানে আলম সিকদার। ২৫ ফেব্রুয়ারি অলিমিয়াহাট বাজারে প্রাণ হারান যুবদল কর্মী মুহাম্মদ আবদুল মজিদ। ২৬ এপ্রিল একই এলাকায় খুন হন যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিন। পরে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় নাসির হত্যা মামলার আসামি মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজুও গুলিতে নিহত হন।
১৩ জুন পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। পুলিশও রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি বালুমহালের নিয়ন্ত্রণকে এ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখেছিল। সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর উরকিরচরের কেরানীহাট বাজারে নিহত হন মোহাম্মদ করিম।
রাউজানের সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে স্থানীয় রাজনীতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয়দের মতে, ২০০৯ সালের পর আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর প্রভাব রাউজানে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। তাঁর বিরুদ্ধে বিরোধী নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করা এবং রাজনীতি ও ব্যবসায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ ছিল। সরকার পতনের পর সেই পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কর্তৃত্ব নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয় বলে স্থানীয়দের দাবি।
বর্তমানে বিএনপির সাংগঠনিক পদ-পদবি, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়েও দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে বলে দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন। এর সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থ যুক্ত হওয়ায় বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অভিযোগ, গোলাম আকবর খন্দকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা-কর্মীরা সক্রিয় থেকে তাঁর অনুসারীদের ওপর হামলা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে গোলাম আকবর খন্দকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর দাবি, বালু-মাটির ব্যবসা, খালের বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ, ইটভাটা, ঠিকাদারি কাজের কমিশন এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়কে কেন্দ্র করেই বিরোধ তৈরি হচ্ছে। তিনি গিয়াস কাদেরকে অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পাল্টা আক্রমণ করেছেন।
দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যেই স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত থামছে না। গত বছরের ২৯ জুলাই সত্তারহাটে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হন। গোলাম আকবরের গাড়িবহরে হামলার অভিযোগ ওঠে এবং তিনি নিজেও ছররা গুলিতে আহত হন। ওই ঘটনার পর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে এবং গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর দলীয় পদ স্থগিত করে। আরও কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবর রহমান শামিম জানিয়েছেন, দলে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের কোনো স্থান নেই। অভিযোগ পাওয়ার পর সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তাঁর এই বক্তব্য থেকে দলের ভেতরে সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উদ্বেগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বলছে, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, সব হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেপ্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে। রায়হানসহ অন্যদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
রাউজানের পরিস্থিতি তাই শুধু দুই রাজনৈতিক নেতার অনুসারীদের বিরোধ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয় না। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, বালু-মাটির নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে স্থানীয় সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ফলে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। বাজার, সড়ক কিংবা বাড়ির সামনে প্রকাশ্যে সংঘটিত সহিংসতা স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তাবোধকে দুর্বল করছে।
দুই বছরে ৩৫ জনের প্রাণহানির এই চিত্র রাউজানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত না হয়, তাহলে সহিংসতার এই চক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এখন স্থানীয় মানুষের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত