প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামোতে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
জাপান সফরের অংশ হিসেবে বুধবার টোকিওতে দেশটির শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে এসব আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও জোরদারের বিষয় গুরুত্ব পায়।
এদিন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটরো) এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের যৌথ আয়োজনে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামেও প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। জেটরোর প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই ফোরামে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও শিল্পায়নে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময়ে জাপান পাশে ছিল। এখন নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, বাংলাদেশে উৎপাদন কারখানা স্থাপন করলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে দেশের বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানির সুযোগও কাজে লাগাতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত জাপানিজ ইকোনমিক জোনের কথা তুলে ধরেন তিনি। জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেখানে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব বিনিয়োগ বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা এবং পরিবহন অবকাঠামোকে বিশেষ গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। তাঁর মতে, বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থাও অপরিহার্য।
জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাপানি কোম্পানিগুলোকে জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রযুক্তি খাতেও দুই দেশের সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবননির্ভর প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
মহাকাশ প্রযুক্তি ও গবেষণার ক্ষেত্রেও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের মহাকাশ সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে জাপানের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার সুযোগ খতিয়ে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নেও জাপানের সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য শহর ও গ্রামের মধ্যে এবং কারখানা ও বন্দরের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা থাকা জরুরি। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
জাপানের অবকাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতার প্রশংসা করে তারেক রহমান বলেন, দেশটি বিশ্বজুড়ে আধুনিক ও কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নির্মাণে সুনাম অর্জন করেছে। তাই বাংলাদেশে দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় সরকার।
বৈঠকগুলোতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের বিষয়গুলোও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী জানান, জাপানি কোম্পানিগুলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্কছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতার বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। সরকার এসব উদ্বেগের কথা শুনেছে এবং ইতোমধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। বাকি বিষয়গুলোও সমাধানের জন্য কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
এদিন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী আকাজাওয়া রিয়োসেইয়ের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচিত সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
জাপানের শিল্পমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় একটি দেশ এবং দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করার পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে জাপানের আগ্রহ রয়েছে। এ সময় আকাজাওয়া রিয়োসেইকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান।
জেটরো প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উন্নত উৎপাদনশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে জাপানি বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় জাপানের সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। জেটরো প্রেসিডেন্টকেও বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
জেটরো প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভৌগোলিক অবস্থানকে বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে দেশটিতে ব্যবসা ও বিনিয়োগের বিষয়ে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতেও জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বিশেষ করে কৃত্রিম তন্তু, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং টেকসই পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। এ খাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
এ ছাড়া জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকোর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশে জেবিআইসির একটি কার্যালয় খোলার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। ব্যাংকটির গভর্নর প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের এই পর্যায়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতার সম্ভাবনাও নতুন করে সামনে এসেছে। বাংলাদেশের জন্য জাপানি বিনিয়োগ শুধু মূলধন প্রবাহ বাড়ানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগও রয়েছে। একইভাবে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশের বড় বাজার, শ্রমশক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সফরের শেষ পর্যায়ে আজ বৃহস্পতিবার টয়োটা মোটোমাচি কারখানা এবং টয়োটা শিল্প ও প্রযুক্তি জাদুঘর পরিদর্শন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এরপর টোকিওতে ফিরে জাপান সফর শেষ করে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে আলোচিত বিনিয়োগ প্রস্তাব ও সহযোগিতার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি, প্রযুক্তি, পোশাক, অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়নের মতো খাতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরে নতুন গতি আনতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত