মেট্রোরেল অর্থায়নে কোরিয়ার অনিশ্চয়তা, আলোচনায় অর্থমন্ত্রী

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৭ বার
মেট্রোরেল অর্থায়নে কোরিয়ার অনিশ্চয়তা, আলোচনায় অর্থমন্ত্রী

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

 রাজধানীর পশ্চিম প্রান্ত গাবতলী থেকে পূর্বাঞ্চলের দাশেরকান্দি পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনায় নতুন করে অর্থায়নসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কোঅপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) ঋণচুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও ঋণচুক্তির বিষয়ে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দক্ষিণ কোরিয়া সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে জাপান সফর শেষে অর্থমন্ত্রীর সিউলে যাওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। সেখানে কোরিয়ার সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকে মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণচুক্তি, বাজেট সহায়তা এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসতে পারে।

ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রস্তাবিত মেট্রোরেল লাইনটি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে। তবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করা, অর্থায়নের শর্ত নিশ্চিত করা এবং নির্মাণকাজের সময়সূচি সমন্বয় করাই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রকল্পটির অর্থায়ন পরিকল্পনায় দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ থেকে প্রায় ১১০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এ অর্থ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জোগান দেওয়ার কথা।

সমকাল ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইআরডির সঙ্গে আলোচনায় কোরিয়া প্রাথমিকভাবে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছিল। এ জন্য দুই পক্ষের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তিও হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত ঋণচুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকল্পের অর্থায়ন পরিকল্পনা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

ইআরডির এশিয়া উইংয়ের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণচুক্তি নিয়ে গত কয়েক মাসে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও কোরিয়ার পক্ষ থেকে জবাব পাওয়া যায়নি। ঢাকায় ইডিসিএফের আবাসিক মিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট মিশন জানিয়েছে, প্রধান কার্যালয় থেকে নির্দেশনা বা জবাব না আসা পর্যন্ত তাদের পক্ষে বিষয়টি সম্পর্কে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।

অবশ্য ঋণচুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টিকে সরাসরি অর্থায়ন প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চূড়ান্ত ঋণচুক্তি, অর্থায়নের শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের সময়সূচি নির্ধারিত না হওয়াই বর্তমানে মূল অনিশ্চয়তা।

কোরিয়ার প্রস্তাবিত ঋণটি তুলনামূলক সহজ শর্তে দেওয়ার কথা। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঋণের সুদের হার বার্ষিক মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ১৫ বছরের রেয়াতকালসহ মোট ৪০ বছরের সময়সীমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্প সুদের ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে মেট্রোরেলের মতো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি এবং বিনিয়োগের সুফল পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। সহজ শর্তে অর্থায়ন পাওয়া গেলে সরকারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম রাখা সম্ভব হয়।

তবে ঋণের শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে সুদের হার, রেয়াতকাল, পরিশোধের সময়সূচি এবং অন্যান্য শর্তের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও সামগ্রিক আর্থিক পরিকল্পনার অংশ।

এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের অর্থায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফের পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব অর্থের সংস্থান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটির আগের প্রস্তাবে মোট ব্যয় প্রায় ৪৭ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। পরবর্তী পর্যালোচনা ও ব্যয় সংশোধনের পর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে একনেকের অনুমোদিত প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। অনুমোদিত হিসাব অনুযায়ী, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা। বাকি প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ থেকে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এডিবি অর্থায়নের জন্য প্রস্তুত থাকলেও প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থায়ন কাঠামো কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি ও অর্থ ছাড়ের শর্ত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। কোরিয়ার ঋণচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে অর্থায়নের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। তবে এর ফলে নির্মাণকাজ নিশ্চিতভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দক্ষিণ কোরিয়া সফরে মেট্রোরেল প্রকল্পের অর্থায়ন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। সেখানে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।

এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। স্যামসাং ও এলজির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কোরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা শুধু মেট্রোরেল প্রকল্পে সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতেও দুই দেশের অংশীদারত্বের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে হলে নীতিগত সমন্বয়, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতালপথ এবং ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার উড়ালপথ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রুটে মোট ১৫টি স্টেশন থাকবে; এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন।

গাবতলী থেকে যাত্রা শুরু করে লাইনটি টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজগেট, আসাদগেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও এবং আফতাবনগর এলাকার বিভিন্ন অংশ অতিক্রম করে দাশেরকান্দিতে পৌঁছাবে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরো পথ পাড়ি দিতে সময় লাগতে পারে মাত্র ২৮ মিনিট।

প্রকল্পের পরিকল্পনায় প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী বহনের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এসব সংখ্যা প্রকল্পের পরিকল্পনাভিত্তিক হিসাব; বাস্তবে যাত্রীসংখ্যা ও যাতায়াতের সময় নির্ভর করবে ট্রেন চলাচলের ব্যবধান, স্টেশনের ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক পরিচালন সক্ষমতার ওপর।

রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমানো গেলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে যাতায়াতকারী যাত্রীরা উপকৃত হতে পারেন। সড়কে যানবাহনের চাপ কমলে পরিবহন ব্যয়, যাত্রাপথে সময় অপচয় এবং নগরজীবনের ভোগান্তিও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

মেট্রোরেল প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য সড়কনির্ভর যাতায়াতের চাপ কমিয়ে গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো। প্রকল্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়িত হলে সড়কে চলাচলকারী প্রায় ১ হাজার ৪৯টি যানবাহনের ব্যবহার কমতে পারে এবং বছরে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ধরনের পরিবেশগত সুফল নির্ভর করবে কতসংখ্যক মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে গণপরিবহনে স্থানান্তরিত হচ্ছেন এবং মেট্রোরেল পরিচালনায় কী ধরনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।

প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের জুনে যাত্রী চলাচলের জন্য লাইনটি খুলে দেওয়ার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছিল। পরবর্তী সংশোধিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে নির্মাণকাজের অগ্রগতি, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ এবং দরপত্র ও ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে সময়সূচি সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এমআরটি লাইন-৫ (দক্ষিণ) প্রকল্প রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। কিন্তু বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য শুধু অনুমোদন বা নকশার ওপর নির্ভর করে না; সময়মতো অর্থায়ন নিশ্চিত করা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণের গুণগত মান এবং যাত্রীসেবার কার্যকারিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ঋণচুক্তি চূড়ান্ত হলে প্রকল্পের অর্থায়ন পরিকল্পনায় স্পষ্টতা আসবে। আর চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দীর্ঘায়িত হলে সরকারকে বিকল্প অর্থায়ন বা বাস্তবায়নসূচি নিয়ে ভাবতে হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য দুই দেশের আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের অপেক্ষা করতে হবে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, মেট্রোরেলের নতুন রুট দ্রুত ও কার্যকর গণপরিবহনসেবা নিশ্চিত করবে। এখন অর্থমন্ত্রীর কোরিয়া সফরে কী অগ্রগতি হয় এবং ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, তার ওপর প্রকল্পটির পরবর্তী অর্থায়ন পরিকল্পনা অনেকটাই নির্ভর করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com