বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত এ আসনে ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারিত রয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগের মুহূর্তে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই ভোটের পরিবেশ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও পদক্ষেপ বিবেচনা করা জরুরি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ায় আসনটি শূন্য হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এ উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে।
বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ঠাকুরগাঁও শহরের একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দাঁড়িপাল্লার কর্মী ও সাধারণ ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিচ্ছেন এবং প্রচারণায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন। বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের সময়ও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
দেলাওয়ার হোসেনের অভিযোগ, গত ১৩ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগের সময় বিএনপির নেতা-কর্মীরা তাঁকে বাধা দেন এবং লাঞ্ছিত করেন। এ ছাড়া গত ২০ অক্টোবর আখানগরে জামায়াতের নির্বাচনী সভা শেষে বিএনপির নেতা-কর্মীদের হামলায় তাঁদের একজন কর্মী আহত হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে জামায়াতের এই প্রার্থী বলেন, বিএনপির প্রার্থী গণসংযোগের সময় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক কর্মকর্তাকে ফোন করে এক মাসের মধ্যে একটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর কথা বলেছেন। অন্য একটি স্থানে অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এসব ঘটনা নির্বাচনে সরকারি সুবিধা বা উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করে ভোটারদের প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ তুলে দেলাওয়ার হোসেন অভিযোগ করেন, গত ২৪ ও ২৫ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকদের দিয়ে বিএনপি তিনটি চিকিৎসা ক্যাম্পের আয়োজন করেছে। তবে এসব ক্যাম্পের আয়োজন, চিকিৎসকদের অংশগ্রহণ এবং এর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
জামায়াতের প্রার্থী আরও অভিযোগ করেন, পরিবার কার্ড, কৃষি কার্ড, বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাওয়া হয়েছে। ভোটার স্লিপ বিতরণের সময় অর্থ দেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, এসব বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিচারিক অনুসন্ধান কমিটির কাছে অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও প্রত্যাশিত প্রতিকার মেলেনি।
দেলাওয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও রিটার্নিং কর্মকর্তাকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আবদুল হাকিম, বর্তমান আমির বেলাল উদ্দিন প্রধান, সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আলমগীর, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কফিল উদ্দিনসহ দলটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, বুধবার রাত নয়টার দিকে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন দলটির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন। লিখিত বক্তব্যে তিনি জামায়াতের প্রার্থী ও ১১-দলীয় ঐক্যজোটের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে উপনির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তোলার দাবি করেন।
মির্জা ফয়সল বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ নির্বাচন কমিশন ও বিচারিক অনুসন্ধান কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্তৃপক্ষের স্বাধীন বক্তব্য বা লিখিত সিদ্ধান্ত পাওয়া না গেলে তাঁর বক্তব্যকে বিএনপির প্রার্থীর দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
বিএনপির এই প্রার্থী বলেন, সাধারণত উপনির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। তাঁর দাবি, ধানের শীষের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ছে এবং এ পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অপপ্রচারের মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছেন।
জামায়াতের প্রার্থীকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফয়সল অভিযোগ করেন, উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও দাবি করেন, জামায়াতের প্রার্থী ও তাঁর নেতা-কর্মীরা সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দিচ্ছেন। এ ধরনের আচরণের অভিযোগ প্রমাণসহ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সংখ্যালঘু ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের বক্তব্য, লিখিত অভিযোগ, প্রশাসনের তদন্ত এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের ভিত্তিতে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, দল-মত, শ্রেণি-পেশা ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব ভোটার যেন নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী, যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কামাল আনোয়ার আহমদ, জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা পারভিন, জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মামুন উর রশিদসহ দলটির নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন উপলক্ষে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। তাঁদের ভোট দেওয়ার জন্য ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রে ৯৮৯টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত।
নির্বাচনী নিরাপত্তায় ২১ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), ২ হাজার ২৭২ জন পুলিশ সদস্য এবং ২ হাজার ৪০৫ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি, বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মাঠে থাকার কথা রয়েছে।
নির্বাচনী কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে চারজন বিদেশি পর্যবেক্ষকসহ ১৭৭ জন দেশি ও স্থানীয় পর্যবেক্ষক থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের পর্যবেক্ষণ, ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম নির্বাচনের পরিবেশ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা বেশি থাকাই সুষ্ঠু নির্বাচনের একমাত্র নিশ্চয়তা নয়। ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ, প্রার্থীদের প্রচারণার সমান অধিকার, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভোট গণনার স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে অন্য পক্ষকে আগেভাগে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নির্বাচনের আগের দিন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রাজনৈতিক পরিবেশকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে ভোটের দিন ভোটাররা কতটা নিরাপদে ও স্বাধীনভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তার ওপর।
সাধারণ ভোটারদের কাছে নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয় নয়; এটি নিজেদের এলাকার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন, জনসেবা এবং জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাই ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে নিরাপত্তা, কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়া ভোট দেওয়া এবং ভোটের ফল সম্পর্কে আস্থা—এসব বিষয় তাঁদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এ সময় সংযম দেখানো জরুরি। অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণসহ উপস্থাপন করা, তদন্তে সহযোগিতা করা এবং সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানোই দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণের পরিচয়। একই সঙ্গে প্রশাসন ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সব প্রার্থীর অভিযোগ সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সত্যতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও ভোট গ্রহণের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটানো এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করাই হবে সংশ্লিষ্ট সবার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত