স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়বে এনসিপি: নাহিদ ইসলাম

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১৪ বার
স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়বে এনসিপি: নাহিদ
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটের প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং দলীয় পরিচয়ে স্বতন্ত্রভাবে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, স্থানীয় নির্বাচনে এনসিপি নিজস্ব প্রতীক, সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চায়। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে নির্বাচন কতটা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কার্যকর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাজবাড়ী পৌর মিলনায়তনে পাঁচ জেলার নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনা ও স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিকল্পনাবিষয়ক মতবিনিময় সভার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। সভায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।

নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে স্থানীয় নির্বাচনে এনসিপির স্বতন্ত্র অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে বিভিন্ন দল ও জোটের সমীকরণ নিয়ে আলোচনা চললেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজস্বভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত দলটির সাংগঠনিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে প্রার্থী বাছাই, তৃণমূলের প্রস্তুতি, নির্বাচনী পরিবেশ এবং ভোটারদের সমর্থনের ওপর।

নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশে রাজনৈতিক সংঘাত, দলীয় অন্তর্কোন্দল এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় বর্তমান পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন কঠিন হতে পারে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে কয়েক শ মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের দলীয়করণের অভিযোগও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে এবং এ বিষয়ে এনসিপি প্রস্তাব দেবে। তাঁর ভাষ্য, অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে নতুন করে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত গোষ্ঠীগুলোর সমঝোতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ বাধাগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও যদি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি কিংবা অনিয়মের অভিযোগ অব্যাহত থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং প্রার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর মতে, কেবল নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত হয় না; ভোটাররা যাতে ভয়ভীতি ছাড়া কেন্দ্রে যেতে পারেন এবং প্রার্থীরা যাতে সমানভাবে প্রচার চালাতে পারেন, সে পরিবেশও তৈরি করতে হয়।

নাহিদ ইসলাম জানান, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের কাছে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা দেওয়া হবে। ওই প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানানো হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচনসংক্রান্ত প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও নির্বাচনে এনসিপি নিজস্বভাবে অংশ নেবে বলে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের প্রশ্নে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় থাকলেও প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটি আলাদা অবস্থান নিতে চায়।

এই অবস্থান এনসিপির জন্য একই সঙ্গে রাজনৈতিক সুযোগ ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দলটি স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, জোটভিত্তিক সমঝোতা ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে অনেক এলাকায় শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলা করতে দলীয় সংগঠন, গ্রহণযোগ্য প্রার্থী এবং কার্যকর নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করতে হবে। বিশেষ করে পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

মতবিনিময় সভায় নাহিদ ইসলাম মাদক সিন্ডিকেট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রশ্রয় ছাড়া মাদক ব্যবসার সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। অতীতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এমন প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে একই ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা থাকলে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাধার মুখে পড়তে পারে।

মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। মাদক ব্যবসা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি তরুণদের ভবিষ্যৎ, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় সমাজের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত। ফলে এ ধরনের অপরাধ দমনে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তবে যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ন্যায়বিচারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। তাঁর বক্তব্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সংস্কার এবং জবাবদিহির বিষয়গুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হিসেবে রয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সরকারের কার্যক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির অভিযোগ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের সুযোগ থাকলে নাগরিকেরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা, তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাহিদ ইসলামের অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য বা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা হয়নি।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পরাজয় ঘটেছে এবং ছাত্র-জনতা জীবন দিয়ে ফ্যাসিবাদ উৎখাত করেছে। তাঁর দাবি, বর্তমানে দলটির কার্যকর রাজনৈতিক তৎপরতা নেই। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী একটি দেশ বাংলাদেশকে চাপে রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করছে এবং দলটির রাজনৈতিক পরাজয়ের পরও তাদের সহযোগীরা সক্রিয় রয়েছে। এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য; সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া এখানে পাওয়া যায়নি।

রাজবাড়ীতে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাটি এনসিপির জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সংগঠনকে আরও সক্রিয় করা এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণের উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়। এতে রাজবাড়ী ছাড়াও ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার নেতাকর্মীরা অংশ নেন। সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব সারজিস আলম।

এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান অপু এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাইয়েদ জামিল। সভায় অংশ নেওয়া নেতাকর্মীদের আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল সাংগঠনিক অগ্রগতি পর্যালোচনা, স্থানীয় পর্যায়ে দলের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং সম্ভাব্য নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে মতবিনিময় করা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নাগরিক সেবা, উন্নয়ন কার্যক্রম, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন। তাই এসব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত শুধু দলীয় শক্তি যাচাইয়ের বিষয় নয়; স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন ও বাস্তব সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার পরীক্ষাও।

এনসিপি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক সক্ষমতা তুলে ধরার বার্তা দিয়েছে। তবে দলটির সামনে নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি বাস্তবায়নের প্রশ্নও রয়েছে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এনসিপির নির্বাচনী সিদ্ধান্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ধারিত হবে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি, প্রার্থী নির্বাচন, ভোটারদের সমর্থন এবং নির্বাচনী পরিবেশের ওপর। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কাছে ১১ দলীয় জোটের প্রস্তাব কী হবে এবং তা বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি ঘটে, সেদিকেও রাজনৈতিক মহলের নজর থাকবে। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তাই দলীয় কৌশলের ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচনী সংস্কার ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ককেও সামনে এনেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com