ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে বিরোধী জোটও সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত আসন নিশ্চিত করতে না পারায় আপাতত ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ভোট গণনার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের হাতে নেই। ফলে নতুন সরকার গঠনের আলোচনা, সম্ভাব্য জোটের সমীকরণ এবং আরব প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর ভূমিকা এখন ইসরায়েলের রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোট গ্রহণের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপ এবং পরবর্তী ভোট গণনার পূর্বাভাসে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও অতি রক্ষণশীল ধর্মীয় দলগুলোর জোট প্রায় ৫৩টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮। ভোট গণনা তখনো চলমান থাকায় এই হিসাব পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার আগে কোনো পক্ষের সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন প্রয়োজন হয়। প্রাথমিক পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন না পাওয়ায় তাঁকে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের আসনসংখ্যাও প্রয়োজনীয় সীমার নিচে থাকায় তাদের জন্য সরকার গঠন করতে অতিরিক্ত সমর্থন সংগ্রহ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আরব ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এসব দল সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে, যা দেশটির নির্বাচনী রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করবে। বিরোধী জোট যদি সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে আরব দলগুলোর সমর্থন তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ইসরায়েলের বহু ইহুদি রাজনৈতিক নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। ফলে সংখ্যার হিসাবে সম্ভাবনা তৈরি হলেও রাজনৈতিকভাবে সেই সমর্থনকে সরকার গঠনের ভিত্তিতে রূপান্তর করা সহজ হবে না।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। তিনি নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান এবং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নেতানিয়াহু এখন একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; তাঁর হাতে নতুন রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নেই বলে আইজেনকট মনে করেন। নেতানিয়াহু যেন নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ব্যবহার করতে না পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানান তিনি।
আইজেনকটের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে বিরোধী শিবিরের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত থাকবে, তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আইনি ক্ষমতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত সরকারের মতোই ক্ষমতা ভোগ করতে পারে। একই সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংযম বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের গবেষক গাই লুরি বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত সরকারের মতো ক্ষমতা পেলেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সংযমের প্রয়োজন হয়। তাঁর এই ব্যাখ্যা ইঙ্গিত দেয়, নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চললেও রাষ্ট্র পরিচালনা পুরোপুরি থেমে থাকবে না। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মতো নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ইসরায়েলের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। ডানপন্থী ও ধর্মীয় রক্ষণশীল দলগুলোর সঙ্গে তাঁর জোট দেশের নিরাপত্তা, ধর্মীয় পরিচয়, ফিলিস্তিন নীতি এবং বিচারব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরে মধ্যবামপন্থী থেকে ডানপন্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি যুক্ত হয়েছে। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্য তাদের মধ্যে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফলে আইজেনকটের জোট সেই প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বেশি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই ব্যবধান তাঁকে সরকার গঠনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখছে। তবে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা এক বিষয় নয়—ইসরায়েলের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্যই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মূল কারণ।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের মধ্যে ভোটদানের হারও উল্লেখযোগ্য ছিল। দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই জনগোষ্ঠীর মানুষ। তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আরব প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন হিসাব তৈরি করেছে।
আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্টের সম্ভাব্য সাফল্যকে ঘিরে তাদের সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দলটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস বলেন, তাঁরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করেন এবং দেশটিতে নিজেদের অবস্থান বজায় রাখবেন। তাঁর বক্তব্যে আরব জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অধিকার এবং ইসরায়েলি রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের প্রতিফলন দেখা যায়।
ইসরায়েলের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরব দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অতীতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানো একটি জোট ছোট একটি আরব দলের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছিল। কিন্তু এবার বিরোধী জোট প্রত্যাশার তুলনায় কম আসন পাওয়ায় তাদের সামনে আরও কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন পাওয়া গেলে বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা এগোতে পারে। তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে ইহুদি দলগুলোর আপত্তি সেই পথকে জটিল করে তুলতে পারে।
ভোট গণনা শেষ হওয়া এবং চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সরকার গঠনের আলোচনা আরও স্পষ্ট হবে। কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে দীর্ঘ দর-কষাকষি, নতুন জোট গঠন কিংবা শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তাঁর এই অবস্থান কত দিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সমঝোতা ও পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর।
ইসরায়েলের জন্য এই নির্বাচনের তাৎপর্য কেবল ক্ষমতার পালাবদলের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। চলমান নিরাপত্তা সংকট, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ফিলিস্তিন প্রশ্ন, আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা—সবকিছুই নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। নির্বাচনের ফলাফল যে পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক হোক, এসব প্রশ্নের সমাধান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, প্রাথমিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে থাকলেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। বিরোধী জোটের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্ভর করছে আরব দলগুলোর সমর্থন ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতার ওপর। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সামনে রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কঠিন চ্যালেঞ্জ। চূড়ান্ত ভোটের হিসাব এবং পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলে কে স্থায়ীভাবে সরকার পরিচালনা করবেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত