সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ধারিত সব পাঠ্যবই দ্রুত পৌঁছে দিতে আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। একই সঙ্গে পাঠ্যবই মুদ্রণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান, কাগজের গুণগত বৈশিষ্ট্য এবং ছাপার স্পেসিফিকেশন কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বইয়ের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস না করার পাশাপাশি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের বিষয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে পুরোনো ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতাহীন মুদ্রণযন্ত্রে বই ছাপানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর কাজ দেওয়া হবে না।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মাতুয়াইলে বর্ণমালা প্রেস ও গ্লোবাল প্রিন্টিং ইকুইপমেন্ট পরিদর্শনকালে এসব নির্দেশনা দেন ববি হাজ্জাজ। পরিদর্শনের সময় তিনি পাঠ্যবই মুদ্রণের বিভিন্ন ধাপ, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সক্ষমতা, কাগজের মান এবং ছাপার সামগ্রিক গুণগত বৈশিষ্ট্য সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত পাঠ্যবই যথাসময়ে সরবরাহের পাশাপাশি সেগুলো যেন মানসম্মত হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পাঠ্যবই কেবল একটি শিক্ষাসামগ্রী নয়; বরং শিক্ষার্থীদের শেখার যাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য বইয়ের অক্ষর, ছবি, রঙ, ছাপার স্বচ্ছতা ও কাগজের মান পাঠ গ্রহণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বইয়ের ছাপা অস্পষ্ট হলে, রঙের বিন্যাসে সমস্যা থাকলে কিংবা পৃষ্ঠার লেখা ও ছবির অবস্থানে অসংগতি দেখা দিলে শিক্ষার্থীদের পড়তে অসুবিধা হতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহের পাশাপাশি সেগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাঠ্যবই মুদ্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করার অর্থ হলো নির্ধারিত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করা। কোনো মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি, কারিগরি সক্ষমতা কিংবা উৎপাদনব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা থাকলে দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগেই তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। কাজ পাওয়ার পর এসব সীমাবদ্ধতার অজুহাতে বইয়ের মানের সঙ্গে আপস করার সুযোগ নেই। সরকার যে মানের বই সরবরাহের জন্য মুদ্রণকাজের দায়িত্ব দিচ্ছে, তা নিশ্চিত করার দায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপরই বর্তায়।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পাঠ্যবই মুদ্রণের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহির ওপর সরকারের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বই প্রস্তুত করতে একাধিক মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে হয়। ফলে উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ না থাকলে একই বইয়ের বিভিন্ন কপিতে গুণগত পার্থক্য দেখা দিতে পারে। আবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার চাপ থাকলেও সেই অজুহাতে ছাপার মান কমিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সময়সীমা ও গুণগত মান—দুই দিকই সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
বইয়ের ছাপার মান পরীক্ষা করতে গিয়ে কয়েকটি বইয়ে রঙের বিন্যাস ও অ্যালাইনমেন্টে অসংগতি দেখতে পান ববি হাজ্জাজ। এ ধরনের ত্রুটি যাতে উৎপাদিত বইয়ের বড় অংশে ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করেন তিনি। একই সঙ্গে মুদ্রণকাজের মান নিয়ন্ত্রণ এবং পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে উঠে আসা এসব অসংগতি পাঠ্যবই তৈরির ক্ষেত্রে নমুনা পরীক্ষা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
মুদ্রণপ্রক্রিয়ায় রঙের সঠিক বিন্যাস ও অ্যালাইনমেন্ট বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের বইয়ে ছবি, চিত্র, মানচিত্র কিংবা রঙের মাধ্যমে বোঝানো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এসব উপাদান ঠিকভাবে ছাপা না হলে বইয়ের উপস্থাপনা দুর্বল হতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু বুঝতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। সে কারণে শুধু বইয়ের সংখ্যা বা উৎপাদনের গতি বিবেচনা না করে প্রতিটি বইয়ের মান যাচাই করা জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাঠ্যবইয়ের মান নিশ্চিত করতে কেবল মুদ্রণকাজ শেষ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিটি বই নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ছাপা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে অবহেলা কিংবা নিম্নমানের কাজ গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর নির্দেশনায় সময়মতো বই সরবরাহের পাশাপাশি উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে গুণগত মান যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে সব বই সরবরাহের নির্দেশ বাস্তবায়নে মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন, মান যাচাই ও সরবরাহের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। সময়সীমা পূরণ করতে গিয়ে যেন ত্রুটিপূর্ণ বই সরবরাহ করা না হয়, আবার মান যাচাইয়ের কারণে যেন সরবরাহপ্রক্রিয়াও অযথা বিলম্বিত না হয়—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এ জন্য মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনায় ভবিষ্যতের মুদ্রণব্যবস্থা আধুনিকায়নের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ববি হাজ্জাজ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যতে আধুনিক ও যথাযথ সক্ষমতাসম্পন্ন মুদ্রণযন্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তাঁর সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী বছর থেকে পুরোনো মুদ্রণযন্ত্রে বই ছাপানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আর কাজ দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে পাঠ্যবই উৎপাদনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মুদ্রণের মান এবং সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, মানসম্মত কাগজের ব্যবহার এবং নিয়মিত ত্রুটি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নতুন মুদ্রণযন্ত্র থাকলেই বইয়ের মান নিশ্চিত হয় না; সেটি সঠিকভাবে পরিচালনা এবং নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করাও প্রয়োজন। তাই ভবিষ্যতে মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতির আধুনিকতার পাশাপাশি সামগ্রিক উৎপাদনব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
এ ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, মুদ্রিত বইয়ের নমুনা মানসম্মত কি না এবং ত্রুটি পাওয়া গেলে তা কীভাবে সংশোধন করা হচ্ছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই সরবরাহের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে কোথাও বিলম্বের আশঙ্কা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
পরিদর্শনকালে এনসিটিবি ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারাও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সামনে প্রতিমন্ত্রী বইয়ের মান ও সরবরাহের সময়সীমা নিয়ে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য সময়মতো পাঠ্যবই পাওয়া শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। বই হাতে পেলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক—সবার জন্য পড়াশোনার পরিকল্পনা করা সহজ হয়। অন্যদিকে বই সরবরাহে বিলম্ব হলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও বাড়িতে পড়ার প্রস্তুতিতে অসুবিধা তৈরি হতে পারে। আবার ত্রুটিপূর্ণ বই হাতে পৌঁছালে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ে এবং সংশোধন বা প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তাই দ্রুত সরবরাহের পাশাপাশি বইয়ের মান নিশ্চিত করাও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষার অপরিহার্য অংশ।
আগামী ৫ নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই সরবরাহের নির্দেশ এখন সংশ্লিষ্ট মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান ও তদারককারী কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা। নির্দেশনার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে, তা নির্ভর করবে উৎপাদনের অগ্রগতি, মান যাচাই এবং সরবরাহের সমন্বয়ের ওপর। একই সঙ্গে আগামী বছর থেকে আধুনিক মুদ্রণযন্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়িত হলে পাঠ্যবই উৎপাদনে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ আরও গুরুত্ব পাবে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারিত হবে শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো, ত্রুটিমুক্ত ও মানসম্মত বই পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত