গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, মানুষের মিলনমেলা আর মাছ ধরার আনন্দ—সব মিলিয়ে একসময় পলো বাওয়া উৎসব ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় আয়োজন। শীতের আগমনী আবহে কিংবা বিলের পানি কমে এলে নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের মানুষ দল বেঁধে নেমে পড়তেন জলাশয়ে। কারও হাতে থাকত বাঁশের তৈরি পলো, কারও হাতে হুসা, আবার কেউ নিয়ে আসতেন জাল। পানিতে পলো চেপে মাছ ধরার সেই দৃশ্য ঘিরে তৈরি হতো উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে সেই চিরচেনা দৃশ্য। মানুষের অংশগ্রহণ ও উৎসবের আমেজ থাকলেও দেশীয় মাছের স্বল্পতা এখন আনন্দের পাশাপাশি হতাশার কারণ হয়ে উঠেছে।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ও শেখর ইউনিয়নের দাদুড়িয়া বিলে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবে এবার এমন চিত্রই দেখা গেছে। গত সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শত শত মানুষ অংশ নেন। সকাল থেকেই বিলের দিকে মানুষের ঢল নামে। কারও হাতে পলো, কারও হাতে হুসা, আবার কেউ মাছ ধরার জন্য সঙ্গে নিয়ে আসেন জাল। উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের মধ্যে ছিল প্রবীণ ও তরুণ—দুই প্রজন্মেরই উপস্থিতি। বিলের চারপাশেও ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। তবে মাছ ধরার প্রত্যাশা নিয়ে পানিতে নামলেও অনেকের মুখেই শেষ পর্যন্ত ফুটে ওঠেনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের হাসি।
পলো বাওয়া কেবল মাছ ধরার একটি পদ্ধতি নয়; এটি গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন ও লোকজ সংস্কৃতির অংশ। একসময় নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের মানুষ একসঙ্গে জলাশয়ে নেমে মাছ ধরতেন। এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের মধ্যে তৈরি হতো আনন্দময় পরিবেশ। অনেকের কাছে এটি ছিল শৈশবের স্মৃতি ফিরে পাওয়ার উপলক্ষ। আবার নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ। মাছ পাওয়া না পাওয়ার বাইরেও এই উৎসব মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করে।
কিন্তু দাদুড়িয়া বিলের এবারের আয়োজন সেই আনন্দের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাও সামনে এনেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগের মতো এখন আর খাল-বিল, নদী ও নালায় দেশীয় মাছ পাওয়া যায় না। একসময় যেসব জলাশয়ে সহজেই নানা প্রজাতির মাছ মিলত, সেসব জায়গায় এখন মাছের উপস্থিতি অনেক কম বলে মনে করছেন তাঁরা। ফলে ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবেও আগের মতো মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে না। মানুষের অংশগ্রহণ বাড়লেও মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় উৎসবের মূল আকর্ষণ অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় মাছ শিকারিদের মতে, দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার, বিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর তৈরি এবং কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ড জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও মাছের প্রজননব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ছোট ফাঁসের জালে মাছের পোনাসহ বিভিন্ন আকারের জলজ প্রাণী আটকা পড়লে মাছের স্বাভাবিক বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
চায়না দুয়ারি জাল নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। এ ধরনের জালের সূক্ষ্ম ফাঁসের কারণে ছোট মাছ ও মাছের পোনাও সহজে আটকা পড়তে পারে বলে তাঁদের ধারণা। মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়লে জলাশয়ে মাছের সংখ্যা পুনরায় বাড়ার সুযোগ কমে যায়। একই সঙ্গে প্রজননক্ষম মাছ ধরা পড়লে পরবর্তী প্রজন্মের মাছের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে এসব কারণের প্রকৃত প্রভাব কতটা, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট জলাশয়ের ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
কৃষিকাজে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কৃষিজমিতে ব্যবহৃত এসব উপাদান বৃষ্টির পানি কিংবা জমির পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে পৌঁছাতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক উপাদান জলজ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং মাছের প্রজনন ও বেঁচে থাকার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে দাদুড়িয়া বিলের মাছ কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব উপাদানের নির্দিষ্ট ভূমিকা জানতে পানির গুণগত মান, জলজ উদ্ভিদ, মাছের প্রজাতি ও প্রজনন পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত পরিবেশগত মূল্যায়ন জরুরি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় এসব জলাশয়ে শিং, মাগুর, কৈ, বাইন, শোল, টাকি, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এসব মাছ শুধু গ্রামীণ মানুষের খাদ্যতালিকার অংশ ছিল না, বরং স্থানীয় জীবিকা ও জলাশয়নির্ভর অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিল। অনেক পরিবার মাছ ধরে নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত মাছ বিক্রি করে আয় করত। কিন্তু এখন আগের তুলনায় এসব মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। ফলে মাছ ধরার ঐতিহ্য যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তেমনি দেশীয় মাছের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনযাত্রাতেও পরিবর্তন আসছে।
দাদুড়িয়া বিলের উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, মাছের স্বল্পতা এখন শুধু কোনো একটি পরিবারের সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় জলজ পরিবেশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বৃহত্তর উদ্বেগের বিষয়। উৎসবে অংশ নিতে অনেকেই সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় অন্তত কিছু মাছ নিয়ে ফিরতে পারবেন। কিন্তু মাছ না পেয়ে কিংবা প্রত্যাশার তুলনায় কম মাছ পেয়ে অনেকেই হতাশ হন। তবুও উৎসবের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমেনি। বরং বহু মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, গ্রামীণ সংস্কৃতির এই আয়োজন এখনো মানুষের আবেগ ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে।
এ বিষয়ে বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস জানান, দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষার জন্য জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিলে পানি জমার পর মাছের পোনা যখন ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে, তখন সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে সেগুলো আটকা পড়তে পারে। এতে মাছের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও পোনা সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। জলাশয়ে মাছের সংখ্যা ধরে রাখতে শুধু মাছ ধরার ওপর নির্ভর করলে চলবে না; মাছের প্রজননক্ষেত্র ও পোনার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা এবং নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বজায় রাখা, জলাশয়ের ভেতরে অপরিকল্পিত স্থাপনা ও পুকুর তৈরি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিজমি থেকে রাসায়নিক দূষণ কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দেশীয় মাছ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণও অপরিহার্য। শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে জলাশয়ের পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন। জেলে, কৃষক, মাছ শিকারি, জলাশয়সংলগ্ন জমির মালিক এবং সাধারণ মানুষকে নিয়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। কোন ধরনের জাল ব্যবহার করা যাবে, কখন মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং কীভাবে মাছের পোনা রক্ষা করা সম্ভব—এসব বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রচার চালানো যেতে পারে। পাশাপাশি বিল ও আশপাশের জলাশয়ের মাছের প্রজাতি, পানির গুণগত মান এবং প্রজনন পরিস্থিতি নিয়ে জরিপ পরিচালনা করলে সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সহজ হবে।
দাদুড়িয়া বিলের পলো বাওয়া উৎসব তাই এবার শুধু লোকজ আনন্দের আয়োজন হয়ে থাকেনি; এটি দেশীয় মাছের সংকট ও জলজ পরিবেশের পরিবর্তন নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। শত শত মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে, ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের প্রাণ যে মাছ, তার উপস্থিতি ক্রমেই কমে গেলে উৎসবের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তাই পলো বাওয়ার আনন্দ ধরে রাখতে হলে শুধু উৎসব আয়োজন করলেই হবে না, ফিরিয়ে আনতে হবে জলাশয়ের প্রাণবৈচিত্র্য। বিলের পানি, মাছের প্রজননক্ষেত্র এবং দেশীয় প্রজাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো আবারও একদিন পলো হাতে উৎসবে নেমে মানুষ মাছ ধরার আনন্দে মেতে উঠতে পারবে। তখন দাদুড়িয়া বিলের উৎসব শুধু মানুষের মিলনমেলা নয়, দেশীয় মাছের সমৃদ্ধিরও প্রতীক হয়ে উঠবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত