তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্য বাড়ছে, দীপের বক্তব্যে অসংগতি

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৪ বার
তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে রহস্য বাড়ছে, দীপের বক্তব্যে অসংগতি

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে থাকা তাঁর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যে একাধিক অসংগতি সামনে আসায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীপের বর্ণনা, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত তাহসিফের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ঘটনার রাতে তাঁর সঙ্গে থাকা দীপের ভূমিকা ও বক্তব্য ঘিরে। প্রথমদিকে দীপ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে তাহসিফের মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য তাঁরা একটি গ্যারেজে যান। পরে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে দুজন নিজ নিজ মোটরসাইকেলে বাড়ির পথে রওনা হন। তাঁর দাবি ছিল, উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকা পর্যন্ত তাঁরা একসঙ্গে ছিলেন। রাত ১২টার দিকে দুজন আলাদা হয়ে যান। এরপর তিনি নিজের বাসায় ফিরে গেলেও তাহসিফের পরবর্তী অবস্থান সম্পর্কে কিছু জানেন না।

কিন্তু তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে দীপের অবস্থান সম্পর্কে তাঁর প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে দেওয়া তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। পিবিআইয়ের অনুসন্ধানে উঠে আসে, দীপ মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফেরেন। পরে তাঁর দেওয়া বক্তব্যে জানা যায়, রেস্তোরাঁ থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা দুজন একসঙ্গে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন হাজী মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রথম বক্তব্যে যে বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেননি, পরবর্তী সময়ে সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

দীপের সর্বশেষ বর্ণনা অনুযায়ী, মঙ্গলবার মধ্যরাতে তাঁরা টঙ্গী পশ্চিম থানার তুরাগ নদসংলগ্ন হাজী মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সেখানে কথা বলার সময় ইউনিফর্ম পরা দুজন ব্যক্তি তাঁদের ধাওয়া করেন বলে দাবি করেছেন তিনি। পরিস্থিতি থেকে নিজেকে আড়াল করতে দীপ তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে দাঁড়ান। অন্যদিকে তাহসিফ দৌড়ে নদীর দিকে যান এবং একপর্যায়ে পানিতে ঝাঁপ দেন বলে তাঁর দাবি। পরে দীপ সেখান থেকে চলে গিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফেরেন।

তবে দীপের এই বক্তব্য নিয়েও তদন্তকারীদের মধ্যে পুরোপুরি নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। তাঁর বর্ণনায় উল্লেখ করা দুই ইউনিফর্মধারী ব্যক্তি কারা, তাঁরা কেন দুজনকে ধাওয়া করেছিলেন এবং তাঁদের পরিচয় কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে কিছু ফুটেজে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য থাকায় সেগুলো প্রযুক্তিগত তথ্য এবং দীপের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তাহসিফের পরিবারের পক্ষ থেকেও দীপের বক্তব্য নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। তাহসিফের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম মনে করেন, তাঁর ছেলের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁর দাবি, তাহসিফ সাঁতার জানতেন এবং পাইলট প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে বিশেষ সাঁতার কোর্স সম্পন্ন করে সনদও অর্জন করেছিলেন। ফলে ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে যাওয়ার বিষয়টি তিনি সহজে মেনে নিতে পারছেন না।

তাহসিফের বাবা বলেন, তাঁর ছেলেকে ধাওয়া করার কোনো কারণ ছিল না। একজন সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা পুলিশের ভয়ে দৌড় দেবেন—এমন ধারণাও তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, ঘটনার প্রকৃত কারণ আড়াল করে বিষয়টি অন্যদিকে প্রবাহিত করার চেষ্টা হতে পারে। তবে পরিবারের এই সন্দেহের বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তদন্তকারীদের কাছে এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেদিন রাতে ঠিক কী ঘটেছিল এবং তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়েছিলেন বা পড়লেন।

এদিকে দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তিসংলগ্ন এলাকা থেকে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি হোন্ডা রোডের পাশে নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় মোটরসাইকেলটি পাওয়া যায়। পরে পুলিশ সেটি জব্দ করে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকেই মোটরসাইকেলটি রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। বৃহস্পতিবার সকালে পুলিশ এসে সেটি নিয়ে যায়। নম্বরপ্লেট না থাকায় মোটরসাইকেলটির মালিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

ঘটনাস্থল ও মোটরসাইকেল উদ্ধারের জায়গার মধ্যে দূরত্ব প্রায় আধা কিলোমিটার। হোন্ডা রোড থেকে হাজী মাজার বস্তির পাশ দিয়ে ইজতেমার মাঠের দিকে গেলে তুরাগ নদের ২৯ নম্বর পিলারটি দেখা যায়। দীপের বর্ণনায় এই পিলারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে উঠে এসেছে। পিবিআই ও নৌ পুলিশের সদস্যরা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে শুক্রবার দুপুরে হোন্ডা রোড, হাজী মাজার বস্তিসংলগ্ন ইজতেমার মাঠ এবং নদীর তীরবর্তী এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে দীপের বক্তব্য অনুযায়ী ঘটনার স্থান ও পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন তদন্তকারীরা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাজী মাজার বস্তির একাংশ এবং ইজতেমার মাঠসংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাটি অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিত হওয়ায় সেখানে পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে বলে জানিয়েছে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশ। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, দুই থেকে আড়াই মাস আগে ওই এলাকায় অভিযান চালানো হলেও মাদকসংক্রান্ত তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে যাতায়াত করেন বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, এলাকাটি মাদকের স্পট হিসেবে পরিচিত হওয়ায় দীপের বর্ণনায় উল্লেখ করা ধাওয়াকারীরা নিরাপত্তাকর্মী কিংবা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কেউ হতে পারেন। তবে তাঁদের পরিচয় বা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি তাহসিফ ও দীপ সেদিন সেখানে কী উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার আগে ও পরে তাঁদের চলাচল, যোগাযোগ এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

পিবিআইয়ের অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান জানিয়েছেন, দীপকে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তবে সেসব তথ্যের সবকিছু যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলটি খোলা মাঠ এবং এর তিন দিকে নদী থাকায় ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি পুনর্গঠন করা সহজ নয়। সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং দীপের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। তাহসিফ ও দীপ মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, তা-ও পরীক্ষার মাধ্যমে জানার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে নৌ পুলিশ জানিয়েছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নৌ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি রেজাউল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে এবং অন্যান্য সংস্থাও তদন্তে সহায়তা করছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। মূল তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে নৌ পুলিশ। পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য মূল তদন্তকারী সংস্থাকে সরবরাহ করছে।

তাহসিফের পরিবার এখনও মামলা করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাঁর বাবা জানিয়েছেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তাঁর বিশ্বাস, সরকার ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে কাজ করবে। তবে নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে পরিবারকে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিবার মামলা না করলে পুলিশ নিজ উদ্যোগে মামলা করতে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।

তাহসিফের ছোট ব্যবসাটি দীপ দেখাশোনা করতেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা। অন্য চাকরিতে ব্যস্ত থাকায় ছেলের ব্যবসার দায়িত্ব দীপের ওপর ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের কাজও দেখাশোনা করতেন তিনি। এ কারণে দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেই সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ঘটনার রাতে তাঁদের একসঙ্গে অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ে দীপের বক্তব্যে পরিবর্তন তদন্তকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

সব মিলিয়ে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পর্যন্ত বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে। ইউনিফর্মধারী ব্যক্তিরা কারা ছিলেন, কেন তাঁরা ধাওয়া করেছিলেন, তাহসিফ কীভাবে নদীতে পড়লেন, দীপ প্রথমে টঙ্গীর ঘটনাস্থলে যাওয়ার তথ্য গোপন করেছিলেন কেন এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলটি সেখানে কীভাবে পড়ে ছিল—এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। পরিবারের সন্দেহ, তদন্তকারীদের পর্যবেক্ষণ এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফল মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে। তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদ্‌ঘাটন এবং পরিবারের কাছে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা পৌঁছে দেওয়াই এখন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রধান দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com