প্রকাশ: ২৭শে জুন ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার সূচনা দিনে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে এক হৃদয়বিদারক ও সংবেদনশীল ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। হাজারো শিক্ষার্থীর মতোই একটি স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে ছুটে এসেছিলেন রাজধানীর এক পরীক্ষার্থী। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—জীবনের এক কঠিন মুহূর্তে তার সামনে এসে দাঁড়ায় এক ‘নিয়ম’, যা ছিন্ন করে দেয় তার পরীক্ষার সব প্রস্তুতি, আশা ও সম্ভাবনার সুতোগুলো।
২৬ জুন, বৃহস্পতিবার, সকাল থেকেই সারাদেশে একযোগে শুরু হয় এইচএসসি পরীক্ষা। ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১২ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে এ বছরের এই গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই রাজধানীর মিরপুরে ঘটে যায় এক ব্যতিক্রমী এবং মর্মান্তিক ঘটনা—যা এখন দেশজুড়ে আলোচনা, বিতর্ক এবং মানবিকতার প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে সকালেই রওনা দেন, কিন্তু ঠিক সেই সময় তার মা হঠাৎ করে মেজর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্নপত্র কিংবা উত্তরপত্র নয়—সেই মুহূর্তে মেয়েটির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মায়ের জীবন। পরিবারের একমাত্র সচল সদস্য হিসেবে নিজেই মাকে নিয়ে ছোটেন হাসপাতালে। মা’কে ভর্তি করিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে ছুটে আসেন রাজধানীর সরকারি বাঙলা কলেজ কেন্দ্রে।
কিন্তু তখন পরীক্ষার নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা শুরুর নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে কেউ হলে প্রবেশ করতে পারেন না। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, তার আর পরীক্ষায় বসার সুযোগ নেই। কোনো ব্যতিক্রমের জায়গা রাখা হয়নি।
ফলে, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ও শোকে মুহ্যমান মেয়েটি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই দৃশ্য দেখে চোখের জল আটকে রাখতে পারেননি পথচারী, অভিভাবক, এমনকি উপস্থিত অন্য পরীক্ষার্থীরাও। মুহূর্তেই এই দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, সৃষ্টি হয় গণমানুষের এক অভূতপূর্ব আবেগ ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
মেয়েটির খালা গণমাধ্যমকে জানান, মেয়েটির বাবা নেই, পরিবারে সাহায্য করার মতো আর কেউও নেই। একা হাতে মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে আবার কেন্দ্রে ছুটে এসেছিলেন সে। কিন্তু শেষমেশ তাকে ‘নিয়মের বেড়াজালে’ পরীক্ষা না দিয়েই ফিরে যেতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—“একজন মানুষ যখন জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে সব কিছু সামলে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছায়, তখনও কি কেবল এক রাশ কাঠামোগত নিয়ম দিয়ে বিচার করা উচিত? মানবতা কোথায়?” কেউ কেউ মন্তব্য করেন, এই দৃশ্যই প্রমাণ করে—প্রশাসনিক কাঠামো কখনো কখনো মানবিক বিপর্যয়ের ভাষা বোঝে না।
তবে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে শুক্রবার (২৭ জুন) সকালে। শিক্ষা উপদেষ্টা সিআর আবরার তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ওই শিক্ষার্থীর পরীক্ষার সুযোগ বিষয়টি পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ সংক্রান্ত আইন ও বিধির আলোকে বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, “আমরা তার এই দুঃসময়ে সহানুভূতির সঙ্গে পাশে আছি এবং তাকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।”
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ঘটনা আরও একবার সামনে নিয়ে এল সেই চিরায়ত দ্বন্দ্ব—মানবিকতা বনাম প্রশাসনিক নিয়ম। শিক্ষা কেবল সনদ অর্জনের পথ নয়, তা একজন মানুষকে সহানুভূতিশীল, ন্যায়বোধসম্পন্ন করে তোলার প্রক্রিয়া। অথচ সেই শিক্ষার মূল ভিত্তিই যদি মানবিকতা থেকে বিচ্যুত হয়, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কোথায়?
এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে একজন কিশোরীর কান্না যেন গোটা ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে রূপ নেয় বাস্তব সমাধানে। যদি সত্যিই মেয়েটিকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা হবে শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়—মানবিকতা ও ন্যায়ের একটি নীরব বিজয়।